পশ্চিম এশিয়া তথা আরব বিশ্বের তেল বিক্রির বিপুল অর্থ পুনরায় চলে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দুনিয়ায়। এই চক্রে তেল ও অর্থ দুই-ই হারায় আরবীয় জনগণ। ফুলেফেঁপে ওঠে আরব বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকজন স্বৈরশাসক, তেল ও অস্ত্র ব্যবসার কতিপয় দালাল এবং পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি। ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত জন চেরিয়ানের নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন অরণ্য রাওল।
আরব বিশ্বের রাজপথগুলো যখন ওই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার দাবিতে প্রকম্পিত, পশ্চিমা দেশগুলো তখন একই এলাকায় হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা খোঁজায় ব্যস্ত। মিসর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বিক্ষোভরত প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত ও সরবরাহকৃত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও ছত্রভঙ্গকারী টিয়ার গ্যাস শেল আর রাবার বুলেটের মতো অস্ত্রশস্ত্র। পশ্চিম এশিয়ার তেল রফতানিকারক দেশগুলোর শাসকরা বহুদিন ধরেই অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়ের পেছনে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে আসছে। নিজেদের অর্থনীতিকে দুরবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়ে এসব অস্ত্রশস্ত্রের বেশিরভাগই কিনেছে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। তাদের এই অতিমাত্রায় পাশ্চাত্যঘেঁষা নীতি ও প্রবণতাই ওই অঞ্চলজুড়ে চলমান বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে। অস্ত্র উৎপাদনকারী বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গী করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো সফর করেছেন।
বিস্ফোরণে উত্তাল একটি অঞ্চলে উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র বিক্রির চেষ্টা করছেন বলে ক্যামেরনের মনের মধ্যে কিন্তু এতটুকু অপরাধবোধ জন্ম নেয়নি। বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালিয়েছিল বলে ফ্রান্সের সঙ্গে ব্রিটেনও সম্প্রতি বাহরাইন এবং লিবিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারীদের সবচেয়ে বড় বাজারটি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পেট্রোডলারের মালিক উপসাগরীয় অঞ্চলের শেখ ও আমির শাসিত দেশগুলো। প্রতিবেশীদের জন্য ইরানকে একটি কাল্পনিক হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়ে ২০০৬-০৯ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে অন্তত ৫০০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ওবামা প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছিল, ২০০৯-১০ সময়কালে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে ১০০০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করতে পারার সুযোগ রয়েছে।
মিসর সরকার ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র কিনেছিল। ইসরাইলের পর মিসরই হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সামরিক সাহায্য পেয়ে থাকে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কালে মিসর ১০৪০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্রশস্ত্র কিনেছে। সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত তিউনিসিয়ার জাইন আল আবিদিন বেন আলি সরকার ২০০৯ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারেরও অধিক মূল্যের সমরাস্ত্র কিনেছিল। গণআন্দোলনে উত্তাল আরেক দেশ জর্ডানও গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪৩ কোটি ১০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র কিনেছে। ক্ষুদ্র দেশ বাহরাইনও যেখানকার মানুষ ফেব্রুয়ারি থেকেই সোচ্চার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১০ কোটি ডলারের অস্ত্র কিনেছে। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের এক মাঝরাতে রাজধানী মানামার পার্ল স্কয়ার এলাকায় অভিযান চালিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে শামিল জনসাধারণের ওপর এসব অস্ত্রের কোনো কোনোটি ব্যবহারও করা হয়েছে। মার্কিন সৈন্যরা ২০০৩ সালে ইরাক দখল করে নেওয়ার পর থেকে সেখানে এ পর্যন্ত ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রয় করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী আট বছরের মধ্যে সমরাস্ত্র ক্রয়ের পেছনে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ১০০০ কোটি ডলার মূল্যের সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মোট অস্ত্র বিক্রির তিন ভাগের এক ভাগই বিক্রয় করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর কাছে। আর এদের মধ্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছে ৬০০০ কোটি ডলারের বিশাল অংকের সমরাস্ত্র বিক্রি করে। এসবের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সামরিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা সিপরি এবং জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কালে সৌদি আরব সামরিক ক্রয় খাতে মোট ৩ হাজার ৪৯০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এই পরিমাণ একই সময়কালে প্রতিরক্ষা খাতে চীন ও ভারতের মোট ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তেল বিক্রি করে সৌদি আরব যে আয় করে তার বড় একটি অংশ মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনা বাবদ খরচ হয়ে যায় এবং এর পরিমাণ হাজার হাজার কোটি ডলার। পশ্চিম এশিয়া সম্পর্কে বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা রবার্ট বায়ের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি রাজতন্ত্র সম্পর্কের অকথিত অংশটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছ থেকে তেল কেনার বিনিময়ে তাকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রদান করে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামরিক বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্ড্রু সাপিরো সম্প্রতি এ মর্মে মন্তব্য করেছেন যে, সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করার অর্থ হলো সৌদি রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্কটিকে আরো শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে দেশটির তেল অবকাঠামোয় নিরাপত্তা আরো শক্তিশাল হবে যা আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পেট্রোডলার প্রদান করে সেটি আবার চক্রাকারে পশ্চিমাদের কাছেই ফিরিয়ে নেওয়ার লাভজনক এই প্রক্রিয়াটি ওয়াশিংটন এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতেও কার্যকর করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে বিশ্বমঞ্চে পুনর্বাসিত করার পর নিকট অতীত ২০০৯ সালেই যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়াতেও চক্রাকারে পেট্রোডলার ফেরত নেওয়ার এ প্রক্রিয়াটি চালু করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এককভাবেই ২০০৯ সালে গাদ্দাফিকে ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি পরিমাণ মূল্যের সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
লিবিয়ার কাছে পাশ্চাত্যের অস্ত্র বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা ২০০৪ সালে তুলে নেওয়া হয়। তবে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল বিদ্রোহী সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিবিয়ায় একটি ‘নো ফ্লাই জোন’ কার্যকর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ত্রিপোলিতে অবস্থিত গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে বেনগাজিতে অবস্থানরত বিদ্রোহীদের অস্ত্র এবং অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে পশ্চিম এশিয়াই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত অঞ্চল। তবে এ অঞ্চলের মানুষই হচ্ছে আবার সবচেয়ে নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী। পাশ্চাত্যের সঙ্গে এই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকদের সখ্যই অস্ত্র ব্যবসাকে ফুলেফেঁপে উঠতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। ব্রিটিশ অস্ত্র কোম্পানি বিএই সৌদি আরবের কাছে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির জন্য সৌদি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করেছিল। এই ঘুষ প্রদান ঘটনার বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কার্যক্রমও চালু হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে এই তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজারেরও বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আর এসব ঘাঁটির বেশিরভাগই অবস্থিত সংঘাতময় পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে। লিবিয়ার সম্রাট রাজা ইদ্রিসকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ১৯৮৮ সালে গাদ্দাফি লিবিয়ায় অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেন। তবে পেন্টাগন উত্তর আফ্রিকায় তার যে সামরিক অবস্থান হারিয়েছে তারচেয়ে বেশি সে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সৌদি আরব, ইরাক এবং আরো বেশ কিছু উপসাগরীয় দেশে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘটিত দু’দুটি যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে বেশ বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
গত শতকের নববইয়ের দশকে সৌদি আরবে মুলমানদের পবিত্রতম ভূমির কাছাকাছি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরব বিশ্বের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই ছিল সৌদি নাগরিক। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরো একজন সৌদি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সৌদি আরব থেকে তার সৈন্যদের বড় একটি অংশ ফিরিয়ে আনলেও এখনো পর্যন্ত রাজধানী রিয়াদের কাছাকাছি গোপনে বেশ কিছু মার্কিন সৈন্যের ছোট ছোট ঘাঁটি রয়ে গেছে। ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ওমানের মাসিরা দ্বীপে এখনো তার একটি সামরিক ঘাঁটি রেখে দিয়েছে। প্রতিবেশী কুয়েতের ঘাঁটিতে মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা পনের হাজার। অধিকৃত ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা কত তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। ওয়াশিংটন শুধু ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশটি থেকে পরিকল্পনামাফিক ব্যাপকসংখ্যক মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার পরও সেখানে বৃহদাকারের পাঁচটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে যাবে। বাহরাইনে অবস্থিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ একটি নৌ ঘাঁটি। এটির অবস্থান হরমুজ প্রণালীর এমন এক স্থানে যেখান থেকে প্রতিবেশী ইরানকে নিয়ন্ত্রণ ও পুরো অঞ্চলের ওপর মার্কিন সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপন সহজ হয়।
ওবামা প্রশাসন যেখানে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত সেখানে খিলাফত শাসনকে কেন প্রশ্রয় দেয় সেটিও মার্কিন এই কৌশল থেকে বোঝা যায়। প্রেসিডেন্ট ওবামা ওই অঞ্চলে কার্যত তার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশের নীতিই অনুসরণ করে চলেছেন। বুশ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর শাসক গোষ্ঠীর অপকর্মকে ওই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অপছন্দের দেশ ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হিসেবেই বিবেচনা করতেন। ওই অঞ্চলের আরব-ইসরাইল বিরোধকে ওয়াশিংটন সব সময়ই আরব-ইরান বিরোধে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে এসেছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দানবীয় কর্মকান্ড হিসেবে প্রচার চালিয়ে পশ্চিমারা ইরান ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি বিরোধের সূত্রপাত ঘটাতে চেয়েছিল। তবে আরব বিশ্বে বর্তমানে বিপ্লবী পরিবর্তনের এক হাওয়া বইছে। এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে দেশগুলোতে সম্ভাব্য যেসব সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তারা ইরানকে হয়তো নিজেদের জন্য তেমন একটি হুমকি মনে করবে না।
কাতারে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি আল উদেইড আফগান ও ইরাক যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৮০টি অত্যাধুনিক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে রাজি হয় যার মূল্য ছিল প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সে দেশে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরটিও সে ব্যবহার করার অনুমতি লাভ করে। সেই বন্দরে জঙ্গি বিমান বহনকারী যুদ্ধজাহাজ নোঙর করার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কার্ডিনিয়াল ডিফেন্স রিভিউতে (কিউডিআর) মন্তব্য করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বৈশ্বিক দায়দায়িত্ব পালনকারী এক বিশ্বশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তার মোট ৪ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে। সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে বলেন, আরব উপদ্বীপের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণ মার্কিন মনোযোগ ও গুরুত্ব প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ওই অঞ্চলটির সঙ্গে আমাদের স্বার্থ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। তিনি ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, ওবামা প্রশাসন উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিক একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যুহ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। নভেম্বরে ওবামা প্রশাসন ঘোষণা দেয়, তারা কুয়েতের কাছে ৯০ কোটি ডলার মূল্যের পেট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করবে।
পেট্রাউস জানান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সেই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও বন্দরসমূহ ব্যবহারের সুযোগকে কাজে লাগিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এ জাতীয় যৌথ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে পারছে। জর্ডানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় নিরাপত্তা বন্ধন রয়েছে। তবে এ দেশটিতেও এখন বিদ্রোহ বিক্ষোভ চলছে। মার্কিন আর্থিক সহায়তায় নির্মিত বাদশাহ আবদুল্লাহ ১১ স্পেশাল অপারেশনস ট্রেইনিং সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে জেনারেল পেট্রাউস জর্ডানকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য পুলিশ ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ক্ষেত্রে দেশটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। আরব বিশ্বে বিশেষত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান চলতে থাকা গণবিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের শিরঃপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেবল নিজের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়- ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে অত্যাধুনিক যেসব সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো নিয়েও এখন তার চিন্তার অন্ত নেই। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগ পর্যন্ত শাহ শাসিত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আঞ্চলিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করত। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় শাহকে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেইসব সমরাস্ত্রের ওপর ইসলামিক রিপাবলিকান অব ইরানের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতিদ্রুতই এসব অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে, সে সময়কার এফ-১৪ জঙ্গি বিমানসহ যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত অন্যান্য সমরাস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ খুঁজে পাওয়া ইরানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
হুসনি মোবারকের মিসরও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক আঞ্চলিক প্রহরী। দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক উপঢৌকনও পেয়েছে। মোবারকের ক্ষমতাচ্যুতির পর যেসব সামরিক নেতৃত্ব এখন দেশ চালাচ্ছেন তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবেই সম্পর্কিত। তবে ওবামা প্রশাসন সেখানকার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিতই আছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক বশংবদ সেজে কাজ করতে পারবে না। এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা করে চলাও তার পক্ষে কঠিন হবে। কারণ ইসরাইল এখনো ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে পদদলিত করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা তাই এখনো ওবামা প্রশাসনকে মিসরের সঙ্গে অনৈতিক সামরিক সহযোগিতামূলক লেনদেন রক্ষা করে চলারই পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে এর ফলে মিসরে মোবারক উত্তর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাটির উত্থান ঘটবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ব্যাপারে মনোযোগীই হবে।
তবে আরব বিশ্বের মানুষ ব্যাপারটিকে ভিন্নভাবেই দেখবে। যুক্তরাষ্ট্র যে সেখানকার কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকগোষ্ঠীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করতে এবং খোদ আরব ভূমিতেই নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলছে তা আরব জনগণের মর্যাদা এবং জাতীয়তাবোধকে ভয়ানকভাবে আহত করছে। তিউনিসিয়া এবং মিসরে যে গণআন্দোলন জন্ম নিয়েছে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরব বিশ্বের প্রত্যাঘাতের শুরুর পর্ব হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন