(লেখাটি প্রকাশিত হয় নভেম্বরের ৫ তারিখে, ২০০০ সালে। এটি লেখকের “বাংলাদেশের তেল-গ্যাস: কার সম্পদ কার বিপদ?” এই শিরোনামের গ্রন্থ থেকে শেয়ার করা হলো। গ্রন্থটি ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন’ থেকে ‘জানুয়ারি ২০০২’ সালে প্রকাশিত হয়।)পাঁচ বছর পুরো হতে চললো। ১৯৯৫ সালের ১০ নভেম্বর নাইজেরিয়ার লেখক-সমাজকর্মী কেন্ সারো-ওয়া সহ ৮ জনের ফাঁসি হয়। এর আগে সামরিক সরকার তাদের গ্রেফতার করে যে বিচার করে তা ছিল এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য যেভাবে সাজানো দরকার সেভাবে সাজানো।
কোন্ সারো-ওয়া এবং তার সহযোদ্ধাদের অপরাধ কি ছিল? অপরাধ ছিল নাইজেরিয়ার শেল কোম্পানির তেল উত্তোলন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি অঞ্চলে পরিবেশে-এর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের চাপা বিক্ষোভকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কেন্ কোন বিপ্লবী সংগঠনের কর্মী ছিলেন না। আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার চাওয়ার চেষ্টার জন্যই তাঁকে জীবন দিতে হয়।
শেল-এর বিরুদ্ধে যে ঘটনকে কেন্দ্র করে পরিবেশ ধ্বংস ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা দায়ের হয় এখন থেকে প্রায় ৯ বছর আগে, সেটি ঘটেছিলো তারও ২০ বছর আগে, ১৯৭০ সালে। ৩০ বছর আগে ঘটনাটি ব্যাপক সংখ্যক এলাকার মানুষকে বিপর্যস্ত করে, পরিবেশ-এর স্থায়ী ক্ষতি করে কিন্তু ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখে এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ, দাবি উত্থাপন সম্ভব হয়নি। কিন্তু ধামা দিয়ে কি চিরদিনের জন্য সবকিছু চাপা দেয়া যায়? অন্যান্য অঞ্চলে পরিবেশ-মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই অঞ্চলের ক্ষতি এতই ব্যাপক ছিল যে ‘উন্নয়ন’-এর আওয়াজ তুলে তাকে ঢাকা দেয়া সম্ভব হয়নি। উন্নয়ন-এর প্রতিশ্রুতি শুনে জনগণের পক্ষেও চোখের সামনের বিপর্যয় উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তার ফলে ক্ষোভ ছিল। মরে যায়নি। মুছে ফেলা যায়নি।
কেন্ এটাকে আইনি পথে ‘মানবাধিকার’ রক্ষার প্রচলিত ধারার মধ্যে দিয়েই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারপরও তাঁকে ফাঁসিতে যেতে হল। সামরিক সরকারের পক্ষে অজুহাত তৈরি অনেক সহজ, সে কারণে গ্রেপ্তার ও দ্রুত ফাঁসির ব্যবস্থা স্বচ্ছন্দে করা সম্ভব হয়েছে।
১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট আবাচা’র মৃত্যুর পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাতে বিষয়টি আবারো সামনে আছে। নাইজেরিয়ায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায় শেল-এর ধ্বংসযজ্ঞ বিরোধী আন্দোলন। এই বছরের এপ্রিলে কেন্-এর রূপক শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। জুন-এ হাইকোর্ট ৯ বছরের সেই মামলার রায়ে শেল-কে ৮ কোটি ডালার ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দেশ দেয়।
সরকার পরির্বতন হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার ভিত্তিতে ধারাবাহিকতা আছে। শেল-এর সর্মথক গোষ্ঠী, সুবিধাবাদী সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী সব গ্রুপের মধ্যে বিস্তৃত আছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাবে ও চাপে আইনি একটি বিজয় অর্জন করেছেন নাইজেরিয়ার জনগণ। কিন্তু তাকে আরও এগিয়ে নেবার অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি বলে এখনও শেল-এর পক্ষে ৩০ বছর আগের ঘটনা নিয়ে আরও দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি সম্ভব হচ্ছে।
এবং সম্ভব হচ্ছে ৩০ বছর আগরে একটি ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াও আরও অসংখ্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, লুণ্ঠন, পাচারের ঘটনা ও প্রক্রিয়াকে আড়াল করা। কেবল কেন্ সারো-ওয়া এবং তার কয়েকজন সহযোগীই নাইজেরিয়ায় বহুজাতিক তেল কোম্পানির আগ্রাসনের শহীদ নন। ৭০, ৮০ ও ৯০ দশক জুড়ে এদেশের বিপুল তেল সম্পদের ওপর বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের দখল নিশ্চিত করবার জন্য সামরিক শাসন, নির্যাতন ও গণহত্যার যে ধারাবাহিকতা চলে তার বলিদেরকেও তেল কোম্পানির ধ্বংসযজ্ঞ বিরোধী লড়াই-এর শহীদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁরা ১, ২, ১০, ১০০ নন, অগণন।
৭০ দশকে নাইজেরিয়ার জনগণও এই কথাটি শুনেছেন, হয়তো বিশ্বাসও করেছেন যে, তেল কোম্পানি তাদের ভাগ্য খুলে দেবে। এই তেল বেচেই সে দেশ হয়ে উঠবে ‘আমেরিকা’, ‘ইউরোপ’। এই বিশাল ‘উন্নয়ন’ কাজের মধ্যে গণ্ডগোল এতই ছিল যে, বহুজাতিক তেল কোম্পানিকে –
(১) তথ্য প্রবাহের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ স্থাপন দরকার করতে হয়েছে;
(২) পুরো প্রক্রিয়ায় জনগণের কোন রকম প্রবেশাধিকার যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হয়েছে, বলপ্রয়োগের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে হয়েছে;
(৩) সবোর্চ্চ মুনাফা নিশ্চিত করবার মত চুক্তি ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন মতো করবার জন্য চরম দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতাবানদের বলয়কে সমর্থনদান ও তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়েছে; এবং
(৪) উন্নয়ন, সম্পদ ও নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে ভুল ধরনা, তথ্য বিভ্রাট, মিথ তৈরি করে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।
এবং এই কাজগুলো নিশ্চিত করবার জন্য অতীব প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে এমন ধরণের শাসন ব্যবস্থা যাকে এক কথায় বলা হয় স্বৈরতন্ত্রী; যেখানে একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী তার প্রবল জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজেদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবে এবং সেই কর্তৃত্বের ঘেরাটোপের মধ্যে নিশ্চিন্তে বসবাস করবে বহুজাতিক কোম্পানি-তেল-গ্যাস কোম্পানি ইত্যাদি। এই ব্যবস্থা হতে পারে সামরিক শাসন, হতে পারে রাজতন্ত্র, হতে পারে বেসামরিক একচেটিয়া শাসন। এই জবরদস্তির প্রয়োজন বাড়ে প্রতিরোধের সম্ভাবনা বাড়লে। আর যদি বুদ্ধিজীবী, সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিবিদদের মধ্যে শক্তিশালী লুম্পেন দালাল গোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে জবরদস্তির পাশাপাশি এটি লুণ্ঠন-পাচারের জন্য আরো নিশ্চিত অবস্থা তৈরি করে।
সে জন্য আমরা যদি তালিকা তৈরি করি দেখবো যেসব দেশে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের ওপর বহুজাতিক সংস্থার একক আধিপত্য আছে, সেখানেই তার সঙ্গে যুক্ত আছে চরম দুর্নীতিবাজ, নির্যাতক, বিপুল সম্পদশালী, দখলদার, সম্পদ পাচারকারী দেশী পক্ষ। এই দেশী পক্ষে কোথাও আছে রাজতন্ত্রী শক্তিসমূহ, কোথাও জেনারেল-আমলা-রাজনীতিবিদ চক্র। তাই মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্রী ব্যবস্থা, আফ্রিকায় বিভিন্ন ধরনের স্বৈরতন্ত্রী ব্যবস্থার সঙ্গে বহুজাতিক সংস্থাসমূহ এবং সেই সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী কেন্দ্রীয় বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সখ্যতা কোন ‘কূটনৈতিক’ ব্যাপার নয়, খুবই জৈবিক ব্যাপার।
মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের তেল সম্পদের প্রায় অর্ধেক মজুদ থাকবার সঙ্গে এ অঞ্চলে রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সকল শক্তির সম্মিলিত চেষ্টা প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। রাজ-বাদশা-শেখ-আমিররা ধর্মকে বর্ম করে টিকে আছে এদেরই আশীর্বাদে।
মধ্যপ্রাচ্যে রাজা-বাদশাহদের কিংবা আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা-এশিয়ার মদদপুষ্ট জেনারেল-আমলাদের গণহত্যা, নির্বর্তন কোন কিছুই একই করণে পশ্চিমী প্রচার মধ্যমে বিশ্লেষণের জায়গা পায়না, অধিকাংশ ঘটনা অন্ধকারে ঢাকা পরে যায়। ইরাক, ইরান, ইন্দোনেশিয়াসহ বহু দেশে নির্বাচিত সরকার উচ্ছেদ করে স্বৈরতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার ভূমিকা তাই বিচ্ছিন্ন বা বিচ্যুত ঘটনা নায়। তেল কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানিকে এগুলোর সাথে সাথেই পাওয়া যাবে।
নাইজেরিয়া, অন্যান্য দেশের মত, এই প্রক্রিয়ায় জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু দানব। বিশাল সম্পদশালী একটি দেশকে কিভাব ছিবড়ে বানিয়ে দিতে হয়, তার স্পষ্ট একটি দৃষ্টান্ত নাইজেরিয়া। দানবেরা খুনি, মাফিয়া এবং বিশাল সম্পদশালী। তাদের অফুরান সম্পদ নাইজেরিয়া থেকে দ্রুত পাচার হয়ে পশ্চিমের ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেট, স্থাবর সম্পদের ব্যবসাকে চাঙ্গা করেছে। পাচার অব্যাহত রাখবার জন্য দেশে গণহত্যা, নির্যাতন দিনে দিনে বেড়েছে। নির্লজ্জ বীভৎস চিত্র: হীন-দীন কোটি মানুষ এবং বিপুল সম্পদশালী কিছু সংখ্যক দানব। আর এই দানবের শরীরের শিরা-উপশিরা, চক্ষু, মগজ দিয়ে প্রবাহিত স্পন্দনে ছন্দময় লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার শেষ মাথায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে শেল কোম্পানি। আন্তর্জাতিক পুঁজির গতি বেড়েছে, মূলধন সংবর্ধন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন রিপোর্টে বিনিয়োগ হিসেবে স্ফীতি হয়েছে। আর প্রচারে, বিজ্ঞাপনে শেল উপস্থিত থেকেছে উন্নয়নের-পরিবেশ রক্ষার অন্যতম নায়ক হিসেবে!
পুরো আফ্রিকা শুধু তেল নয়, অন্যান্য খনিজ সম্পদের দিক থেকেও বিশ্বের অন্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সম্পদ যদি বেশি থাকে এবং সেই সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মতো রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি না থাকে তাহলে সম্পদ কিভাবে আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপে পরিণত হয়, তা বোঝার জন্য আফ্রিকার দিকে তাকানো খুব দরকার। তেল, সোনা, হীরার বিপুল মজুত একদিকে, অন্যদিকে দারিদ্রের স্থায়ী উপস্থিতির চিত্র পাশাপাশি যে স্থির হয়ে আছে তা নয়, সেই মজুত দখল ও পাচারের মধ্য দিয়ে দারিদ্রের চেহারা আরও বীভৎস হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে ঐ দেশের মধ্যে একটি দুঃশাসনের অচলায়তন এবং তার ওপর মাফিয়া গোষ্ঠীর ক্ষমতা।
এই প্রক্রিয়া তাই – প্রচলিত ‘উন্নয়নের অর্থশাস্ত্রের’ প্রতারণারও একটি চেহারা, যেটি লুণ্ঠন, পাচার ও দানব সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ‘বিদেশী বিনিয়োগ’, ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং আড়াল করে ধ্বংস, অপচয় ও পাচারের জৈবিক সম্পর্কগুলো।
এসব আড়ালের পেছনে ক্রমাগত পতনের মধ্যে দিয়ে নাইজেরিয়া অন্য অনেক দেশের মত ধুকছে – প্রতারণামূলক ভাবে তাকে ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে দেখানোর অবস্থাও আর নেই। মাথাপিছু আয় দেখিয়ে অনেক প্রতারণা হয়। কিন্তু অন্য আর সব সূচক বাদ দিয়ে যদি শুধু ‘মাথাপিছু আয়’ দিয়েই নাইজেরিয়াকে বিবেচনা করি তাহলেও তার শরীর যে কিভাবে শুকিয়ে আসছে, কিভাবে রক্তশূন্য জিরজিরে অবস্থার দিকে দ্রুত এগুচ্ছে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল, তা বোঝা যাবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব থেকেই আমরা দেখি ১৯৭৭ সালে নাইজেরিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ৪২০ ডিলার, থাইল্যান্ডের সমান। সে সময় শ্রীলংকায় ছিল ২০০ এবং বাংলাদেশে ৯০। ১৯৮৩ তে সামরিক শাসন জারির সময় নাইজেরিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ৭৭০ ডলার, বাংলাদেশে তখন ১৩০। প্রধানত শেল-এর নিয়ন্ত্রণে তেল উৎপাদন ও রফতানি এদেশে সে সময় থেকে বাড়ে এবং মোট রাজস্ব আয়ে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ দাড়ায় তেল থেকে প্রাপ্ত আয়। তেল উত্তোলন ও বিক্রি প্রসঙ্গে যে হিসাব নাইজেরিয়ার সরকারি দলিলে পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে বরাবরই সন্দেহ থেকেছে। এই অসঙ্গতি এতটাই ছিল যে, মাঝে মধ্যে উত্তোলিত তেলের শতকরা ৫০ ভাগের হিসাব নিয়েই গরমিল দেখা যেতো। সামরিক শাসন সব গরমিল ধামাচাপা দেবার জন্য খুবই উপযোগী ব্যবস্থা। নাইজেরিয়াতেও তা কার্যকর থেকেছে।
একদিকে তেল থেকে বিপুল আয়, অন্যদিকে অর্থনীতিতে সংকট বৃদ্ধি, মুদ্রামান হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ৮০ দশকেই নাইজেরিয়াকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের বিপরীত দকে বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও দেশীয় দানবদের স্ফীতিলাভ চলছিল একটানা। এই প্রক্রিয়ার ১৯৯১ সালে সেখানে মাথাপিছু আয় ৭৭০ ডলার থেকে হয় ৩৪০ এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত বছর নাগাদ এর পরিমাণ হয় ৩০০ ডলার। অর্থাৎ ‘বিদেশী বিনিয়োগে’র পরশপাথর ছোঁয়ায় তেল উৎপাদনের সোনালি ভবিষ্যতে যাত্রা করে নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় দুই দশকে শতকরা ৪০ ভাগে এসে ঠেকেছে। অথচ একই সময়ে বহু যুদ্ধ সংঘাত সত্বেও শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় বেড়েছে শতকরা ৪০০ ভাগ। এবং বাংলাদেশ দারিদ্র ও নির্ভরশীলতার কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচিত হয় সেখানেও মাথাপিছু আয় গিয়ে পৌঁছেছে ১৩০ থেকে প্রায় ৩৫০ ডলার। বাংলাদেশ এখন গুছিয়ে গ্রহণ করতে যাচ্ছে নাইজেরিয়ার পথ।
নাইজেরিয়ার এই অবস্থা কি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা? পুরো আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকা বিবেচনা করলে আমরা দেখবো, না। নাইজেরিয়া কোন ব্যতিক্রম নয়। নাইজেরিয়া একই মডেল’এর অন্তর্ভুক্ত একটি দৃষ্টান্ত। জনগণকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা এবং এক পর্যায়ে কেন্ সারো-ওয়া’র মত প্রতিবাদী কণ্ঠকে ফাঁসি কাষ্ঠে উঠানো এই মডেল’এরই অন্তর্গত বিষয়।
(আমার নোট: ২০০০ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়া আনু মুহাম্মদের এই লেখাটি প্রায় ১১ বছর পর বর্তমান সময়েও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে হাজির হয়েছে। বিশেষ করে ১৬ জুন ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’ এর অধীনে মার্কিন কোম্পানি ‘কনোকফিলিপসে’র সাথে ‘পেট্রোবাংলা’র চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে আমাদের সমুদ্রের ২টি গ্যাস ব্লক – ১০ ও ১১ নং; মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের চুক্তি নতুন কিছু নয়। আমরা জানি এর আগেও এমন চুক্তির আওতায় বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে স্থলভাগের গ্যাস ব্লক তুলে দেওয়া হয়েছিলো। তাহলে ‘কনোকোফিলিপসে’র সাথে এই চুক্তির নতুন দিকটি কোনটি?
নতুন দিকটি হলো, জনগণের সচেতন-দেশপ্রেমিক অংশটির প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চেষ্টা, দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি প্রদান, মানুষের মাঝে চুক্তির বিভিন্ন শর্তাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ইত্যাদি। এর ধারাবাহিকতায় ৩ জুলাই ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্ধর রক্ষা জাতীয় কমেটি’র আহ্বানে ঢাকা শহরে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। তৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার এই হরতালে প্রতিরোধে যে ফ্যাসিস্ট ও আগ্রাসী তৎপরতা চালায় তার লাঠিয়াল বাহিনীর দ্বার, সেইটি। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে এইটাই প্রমাণ হয়, জাতীয় সম্পদ রক্ষার ইস্যুতে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এইটি গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হবে। আর আমাদের দেশের মেরুদণ্ডহীন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকার সেই ভয়ে ভিত।
নাইজেরিয়াতে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে জনগণ অংশগ্রহণ করেছিলো, এবং কত মানুষ যে শহীদ হয়েছিলো, তার কোন সঠিক হিসাব নাই। বাংলাদেশেও নিশ্চয়ই জনগণ তার চাইতেই তীব্র এবং সফল আন্দোলন গড়ে তুলে এই লুটেরা-বহুজাতিকদের সকল তৎপরতা বন্ধ করে দিবে, এবং একই সাথে এই দেশে বহুজাতিকদের দালাল, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকেও প্রতিহত করে ইতিহাসের আস্তকুড়ে নিক্ষেপ করবে। এই প্রত্যাশা করে, এবং আগামী দিনে জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াই-সংগ্রামে সকল দেশপ্রেমিক বন্ধুদেরকে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে এই লেখাটি শেয়ার করলাম। সেই সাথে নাইজেরিয়ার লেখক-সমাজকর্মি শহীদ ‘কেন্ সারো-ওয়া’ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সেই সকল শহীদেরকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাই, যারা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফার অগ্রাসন থেকে মানুষ-পরিবেশ রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন