বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০১১

বাঙলাদেশের শাসক শ্রেণী ও সংবিধান বিতর্ক / বদরুদ্দীন উমর

প্রাক-পুঁজিবাদী যুগে রাজা-বাদশারাই দেশ শাসন করতেন। কোন সংবিধানের অধীনে এই শাসন চলতো না। প্রত্যেক দেশের সমাজ ব্যবস্থায় তাদের নিজস্ব কিছু প্রচলিত নিয়মকানুন, রীতিনীতি ছিল। সেই নিয়মকানুন, রীতিনীতির সাথে শাসক রাজা-বাদশাদের দ্বারা নির্দিষ্ট ও প্রচলিত আইনকানুন যুক্ত হয়ে আইনের একটা কাঠামো থাকতো। সেই কাঠামোর অধীনেই রাজা-বাদশারা শাসন কাজ পরিচালনা করতেন। তবে আইনের এই কাঠামো এমন হতো না, যা রাজা-বাদশারা পবিত্র জ্ঞানে সব সময় মান্য করতেন। কাজেই এর লঙ্ঘন প্রায়ই ঘটতো, কারও ক্ষেত্রে কম, কারও ক্ষেত্রে বেশী। আইনের এই লঙ্ঘনকেই বলা হতো স্বেচ্ছাচারিতা (despotism)। এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা প্রাক-পুঁজিবাদী রাজা-বাদশাদের যুগে ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার।

পুঁজিবাদের আবির্ভাব ও তার বিকাশ ঘটতে থাকার সাথে সাথে সমাজের সর্বক্ষেত্রে শৃংখলার প্রয়োজন বেশী করে দেখা দেয়। এই শৃংখলা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হতে থাকে নোতুন নোতুন আইনকানুনের। স্বেচ্ছাচারী রাজা-বাদশারা ছিলেন সামন্তবাদী শাসক। সামন্তবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা ও তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে বিন্যস্ত সমাজ সম্পর্কের মধ্যে স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ থাকতো। এই স্বেচ্ছাচারিতার অর্থ বাস্তবতঃ ছিল রাষ্ট্রশক্তির অধিকারীদের জবাবদিহিতার কোন আইনগত ব্যবস্থা না থাকা, তাদের নিজেদের স্বার্থে জনগণের ওপর ইচ্ছেমত হামলা করা, তাদেরকে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, ব্যক্তি স্বাধীনতার বিকাশ রুদ্ধ করা।

এই সমাজ কাঠামো ভেঙেই পুঁজিবাদ নিজের বিকাশ ঘটাতে শুরু করে। স্বেচ্ছাচারিতার অবসান এই বিকাশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। এর জন্য প্রয়োজন হয় জবাবদিহিতার এবং জবাবদিহিতার জন্য কার্যতঃ প্রয়োজন হয় এমন আইন যার দ্বারা সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র শাসিত হবে, যাকে মান্য করে চলা সমাজে সকলের জন্যই হবে বাধ্যতামূলক। পুঁজিবাদের বিকাশের প্রক্রিয়ায় অনির্বাচিত রাজা-বাদশাদের ক্ষমতা কমে আসতে থাকে। ক্রমশঃ দেশের পর দেশে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ অথবা কার্যকরভাবে উচ্ছেদ হতে থাকে। রাজতন্ত্রই ছিল স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চ রূপ। স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনেই শাসন ব্যবস্থায় উদ্ভব ঘটে শাসনতন্ত্র বা সংবিধানের।

সংবিধান হলো, রাষ্ট্রের মৌলিক আইন যার কাঠামোর মধ্যে প্রণীত হয় অন্যান্য আইন। এর অর্থ যে কোন আইনকেই এই কাঠামোর অন্তর্গত ও এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। কারও অধিকার থাকবে না এই কাঠামোর বাইরে আইন প্রণয়ন করা অথবা এর অন্তর্গত কোন আইন ভঙ্গ করা। অর্থাৎ কেউ এ কাজ করলে তাকে জবাবদিহি করতে হবে, এ কাজ স্বেচ্ছাচারিতা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর জন্য শাস্তি পেতে হবে।

শুধু পুঁজিবাদই নয়, সংগঠিত যে কোন আধুনিক ব্যবস্থাতেই সংবিধান হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। এ কারণে পুঁজিবাদের থেকে উন্নততর ব্যবস্থা সমাজতন্ত্রেও সংবিধানে আরও কঠোরভাবে জবাবদিহিতা কার্যকর এবং আইনের শাসন পরিচালনার ব্যবস্থা থাকে।



দুই

১৯৭১ সালে বাঙলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭২ সালে এ দেশের সংবিধান প্রণীত হয়। কিন্তু যেভাবে এই সংবিধান প্রণীত ও তৎকালীন জাতীয় সংসদ কর্তৃক গৃহীত হয় তার দ্বারাই সংবিধান প্রণয়নের রীতিনীতি গুরুতরভাবে, বলা চলে মৌলিকভাবে, লঙ্ঘিত হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়ন কোন খামখেয়ালী বা ছেলে খেলার ব্যাপার নয়। যেহেতু স্বেচ্ছাচারিতার অবসান সাংবিধানিক শাসনের প্রধানতম উদ্দেশ্য সে কারণে সংবিধান প্রণয়নের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি হলো, সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে শুধু সংবিধান প্রণয়নের জন্যই একটি সংবিধান সভার নির্বাচন। পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছিল। সে জাতীয় সংসদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি নোতুন সংবিধান প্রণয়ন। এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বার বার বলেছিলেন যে, ছয় দফা ও এগারো দফার ভিত্তিতেই নোতুন সংবিধান নির্মিত হবে। ১৯৭১ সালের ৩রা জানুয়ারী তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) শেখ মুজিব নিজে কোন শপথ গ্রহণ না করলেও [!] তিনি জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যদের এক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁরা এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেছিলেন যে, জনগণ আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি প্রতিষ্ঠার জন্য ছয় দফা ও এগারো দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে তাঁদেরকে নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁরা সেই ভিত্তিতেই সংবিধান রচনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। বলাই বাহুল্য যে, ছয় দফা ও এগারো দফার ভিত্তিতে আত্মনিয়ন্ত্রণের এই ব্যবস্থা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার কোন প্রশ্ন সেখানে ছিল না, স্বাধীন বাঙলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কোন চিন্তা করে জনগণ সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট প্রদান করেন নি। নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সংসদকে সে সময় ছয় দফা ও এগারো দফার ভিত্তিতে সংবিধান রচনার যে ম্যান্ডেট বা এখতেয়ার দেওয়া হয়েছিল সেটা ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন যাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার স্বীকৃতি হবে।

কোন রাষ্ট্রের একাধিক অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের ভিত্তিতে রচিত সংবিধান এবং একটি স্বাধীন দেশের সংবিধান এক জিনিস নয়। শুধু তাই নয়, একটি দেশ বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে স্বাধীন হওয়ার পর সেই স্বাধীন দেশের নোতুন সংবিধান রচনার ঘোষিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে নোতুন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংবিধান সভা হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এইভাবে প্রাপ্ত দায়িত্ব বা এখতেয়ার ব্যতীত একটি স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের কোন গণতান্ত্রিক বৈধতা অন্য কোন ধরনের সংসদেরই নেই।

এসব চিন্তা না করে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্য যে জাতীয় সংসদ নির্বাচিত হয়েছিল সেই সংসদের সাথে একই সময়ে নির্বাচিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সংসদকে যুক্ত করে উভয় সংসদের সদস্যদেরকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাঙলাদেশের জাতীয় সংসদ। এইভাবে গঠিত জাতীয় সংসদেই স্বাধীন বাঙলাদেশের খসড়া সংবিধান উপস্থিত করা হয়েছিল। এই সংসদই সেই খসড়া অনুযায়ী প্রণয়ন করেছিল বাঙলাদেশের সংবিধান।

১৯৭০ সালে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সমন্বয়ে গঠিত পার্লামেন্টের অধীনে সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে একটি নোতুন সংবিধান সভার জন্য কোন নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার মধ্যে যে অবৈধতা ও ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া এবং ঔদ্ধত্য ছিল তার দ্বারাই ১৯৭২ সালের সংবিধান খুব স্পষ্টভাবেই চিহ্নিত হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন নেতা শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় ও সরকারী ক্ষমতা হাতে নিয়ে প্রকৃতপক্ষে স্বেচ্ছাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, নোতুন সংবিধান সভা গঠনের জন্য নির্বাচন দেওয়া অর্থহীন, কারণ সে সময় নির্বাচন দিলে তাঁরাই নির্বাচিত হবেন ও সংবিধান সভা গঠন করে সংবিধান তৈরী করবেন। কাজেই নোতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নোতুন সংবিধান সভা গঠনের কোন প্রয়োজন নেই! এর মধ্যে শেখ মুজিবের চিন্তার যে বিপজ্জনক সীমাবদ্ধতার দিকটি স্পষ্ট হয়েছিল তা হলো, পাকিস্তান আমলের পূর্ব বাঙলা বা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে স্বাধীন বাঙলাদেশের পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর অক্ষমতা। তাঁর এই উপলব্ধির অভাবের মূল কারণ ছিল, ১৯৭১ সালে নয় মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে তাঁর নিজের কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা না থাকা। শুধু তাই নয়, তাঁর এই ভূমিকার অভাব, তাঁর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও স্বাধীন বাঙলাদেশের সৃষ্টি, যা তিনি ১৯৭১ সালে মার্চ মাসেও অনেক বাগাড়ম্বর করা সত্ত্বেও বিশ্বাস করতে অপারগ ছিলেন, তাঁর মধ্যে এমন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল, তাঁর অহমিকাতে এমন আঘাত করেছিল যাতে তিনি ১৯৭১ সালে কি ঘটেছিল তার বিবরণ জানার কোন চেষ্টাই করেন নি। তাঁকে তাজউদ্দিন প্রভৃতি অন্যরা সেটা জানানোর চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি তা শোনেননি, শুনতে প্রস্তুত ছিলেন না। অহমিকাজনিত কারণে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘটনাবলী ও বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে নিজেকে অনবহিত ও অজ্ঞ রাখার এই সিদ্ধান্ত তাঁর, তাঁর দলের ও দেশের প্রভূত ক্ষতি করেছিল। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তাঁর সরকার উচ্ছেদ হওয়ার কারণও অনেকাংশে এর মধ্যেই নিহিত ছিল। নোতুন নির্বাচনের মাধ্যমে নোতুন সংবিধান সভা গঠন না করে পাকিস্তান আমলে গঠিত জাতীয় সংসদকে দিয়ে ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন ছিল তাঁর স্বেচ্ছাচারী ও নানা ভ্রান্ত কাজের অন্যতম প্রধান দৃষ্টান্ত।

যেভাবেই হোক, একটি সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজনীতির ক্ষেত্রে যে সব নোতুন শক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল ও সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও তাদের যে প্রতিনিধিত্বমূলক ভূমিকার প্রয়োজন ছিল তার গুরুত্ব উপলব্ধি শেখ মুজিবের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কাজেই তার কোন হিসেবও তাঁর ছিল না। কমিউনিস্ট নামধারী যে বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের তল্পিবাহক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন এ ব্যাপারে তাঁদেরও কোন উপলব্ধি ছিল না। কাজেই স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে সব নোতুন রাজনৈতিক উপাদান সংবিধান রচনাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে অবদান রাখার কথা ও যাঁদের প্রতিনিধিত্বের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সংবিধান সভার নোতুন নির্বাচন দরকার ছিল তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পাকিস্তানী জাতীয় সংসদকে দিয়ে ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাঙলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছিল। নোতুন সংবিধান সভা, যা নোতুন সংবিধানের অধীনে নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ হিসেবেও কাজ করতো, তার গঠনের আগে পর্যন্ত পুরাতন জাতীয় সংসদ সরাসরি কাজ চালিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু তাকে দিয়ে নোতুন সংবিধান প্রণয়নের কাজ করিয়ে নেওয়ার মধ্যে যেমন কোন বৈধতা ছিল না, তেমনি ছিল না কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়। শুধু তাই নয়, এভাবে সংবিধান প্রণয়নের মধ্যে যে স্বেচ্ছাচারিতা ও দেউলিয়াপনা ছিল তার দ্বারাই বাঙলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে দেশে এক অরাজক ও সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে ১৯৭৫ সালে আওয়ামী বাকশালী শাসনই উচ্ছেদ হয়েছিল।

ভারতে ও পাকিস্তানে স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নের জন্য নোতুন নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল না। কারণ ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্বাচনের মাধ্যমে যে পার্লামেন্ট গঠিত হয়েছিল তার ঘোষিত লক্ষ্যই ছিল ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণয়ন। ভারত বিভক্ত হলে ১৯৪৬ সালে নির্বাচিত পার্লামেন্ট দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত দুই অঞ্চলে দুই পৃথক রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের জন্য স্বতন্ত্রভাবে গঠিত হয়েছিল।



তিন

১৯৭২ সালের সংবিধানের নোতুন সংশোধনীর জন্য এখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অনেক তোড়জোড় চলছে। এসব সংশোধনীর উদ্দেশ্য হলো, ১৯৭২ সালের সংবিধানের সাথে সামঞ্জস্যহীন সংশোধনীগুলি বাতিল করে মূল সংবিধানের বিশুদ্ধতা রক্ষা, সেই সংবিধানকে তার “পূর্র্ব গৌরবে” প্রতিষ্ঠা করা! এছাড়া এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সংবিধানের মধ্যে এমন সংস্থান রাখা যাতে ভবিষ্যতে বাঙলাদেশে কোন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক শাসন কায়েমের পথ আইনগতভাবে রুদ্ধ হয়!! এই উভয় উদ্দেশ্যই যে অবাস্তব ও উদ্ভট এবং তা সফল হওয়া কোনক্রমেই সম্ভব নয়, এ বিষয়টি প্রথমে আলোচনা করা দরকার।

সংবিধান হলো একটি দেশের মৌলিক আইন যার কাঠামোর মধ্যে ও যার সাথে সঙ্গতিপূর্ণভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য আইন প্রণীত হয়ে থাকে। এই মূল আইন বা সংবিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। এ জন্য রাষ্ট্রের সাথে সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রই নির্ধারণ করে দেশের সংবিধানের চরিত্র। রাষ্ট্র যে সকল স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে ও যে সকল স্বার্থ রক্ষা করে, সেই স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব ও রক্ষা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধানের নির্ধারিত কাজ। কাজেই রাষ্ট্রের চরিত্রই এ ক্ষেত্রে মৌলিক। সংবিধানের চরিত্র রাষ্ট্রের চরিত্র কাঠামোর দ্বারাই সর্বতোভাবে নির্ধারিত হওয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে যেমন সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তেমনি সংকটজনক ও জরুরী পরিস্থিতিতে প্রচলিত সংবিধান রাষ্ট্রীয় শক্তির স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে সংবিধান উচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাওয়া এবং রং বেরং-এর সামরিক অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন অপরিহার্য।



চার

প্রথমেই মনে রাখা দরকার যে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর ভারতে, পাকিস্তানে এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাঙলাদেশে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছে সেই সব সংবিধান ব্রিটিশ আমলে, অর্থাৎ স্বাধীনতার আগে দুশো বছর ধরে যে সব আইন প্রচলিত ছিল সেগুলি সব বাতিল করে নি। শুধু তাই নয়, নোতুন সংবিধানে সেই সব আইন স্বীকৃত থাকার কারণে এখনো সেগুলি দ্বারা স্বাধীন রাষ্ট্রের অনেক কাজই ভারত, পাকিস্তান, বাঙলাদেশে পরিচালিত হয়ে থাকে। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, ব্রিটিশ ও পরবর্তী আমলে যে সকল শক্তি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে তাদের মধ্যেকার নাড়ীর সম্পর্ক ছিন্ন হয় নি। অর্থাৎ ব্রিটিশ আমল ও পরবর্তী স্বাধীন আমলের রাষ্ট্রের চরিত্রের মধ্যে একটা ঐক্য আছে যে ঐক্য আইনের ধারাবাহিকতার মাধ্যমেই রক্ষিত হয়।

রাষ্ট্রের চরিত্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তার শ্রেণী চরিত্র। পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক যে রাষ্ট্রই হোক, তার শ্রেণী চরিত্র থাকে, অন্ততঃ তাতে পুঁজি স্বার্থ অথবা শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থ নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। এ প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে, দেশে দেশে প্রচলিত পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যেও পার্থক্য থাকে। সমাজের বিকাশের পর্যায় অনুযায়ী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সামন্তবাদী স্বার্থ এবং সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুঁজিবাদী স্বার্থ, তুলনায় গৌণ হলেও, একটা ভূমিকা পালন করে। এ কারণেই দুনিয়ার বিভিন্ন পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র হুবহু এক হয় না। তার মধ্যে ভিন্নতা থাকে।



পাঁচ

যাঁরা বাঙলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক বাগাড়ম্বর করেন, স্বাধীনতা-উত্তর পরিস্থিতি ও বাঙলাদেশের সংবিধান নিয়ে আলোচনা করেন, তাঁদেরকে বাঙলাদেশের শাসক শ্রেণীর চরিত্র, তাঁদের শ্রেণী চরিত্র নিয়ে কোন কথা বলতে শোনা যায় না। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে যে, এ বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর শাসক শ্রেণী হিসেবে যারা আবির্ভূত হয় তাদের চরিত্রের মধ্যে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা রীতিমত বিপজ্জনক। এই বিপদ এমন, যা একটি সুগঠিত শোষক শ্রেণী, উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত শাসক শ্রেণীর শাসনের মধ্যে দেখা যায় না।

১৯৭১ সালে বাঙলাদেশে আওয়ামী লীগ শুধু সরকারী ক্ষমতায় নয়, রাষ্ট্র ক্ষমতাতেই অধিষ্ঠিত হয়েছিল। এই শাসক দল ১৯৪৯ সাল থেকে এক ধরনের রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যে থাকলেও তারা ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রকৃতপক্ষে পূর্ব বাঙলা বা পাকিস্তানের কোন ধরনের উৎপাদনশীল শক্তির প্রতিনিধিত্ব করতো না। এই পুরো সময়টা আওয়ামী লীগ যেমন কৃষক শ্রমিকসহ অন্য কোন উৎপাদনশীল শোষিত শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে নি, তেমনি তারা কাজ করতে পারে নি এখানকার ভূমি মালিক এবং শিল্প ব্যবসা মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে। এর কারণ এক দিকে যেমন তারা ছিল সামাজিক অবস্থান ও লক্ষ্য আদর্শের ক্ষেত্রে শ্রমজীবীদের সাথে সম্পর্কহীন, তেমনি অন্যদিকে ভূমি মালিক এবং শিল্প ব্যবসা মালিকরা পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসক শ্রেণীর সাথে নানা সূত্রে সম্পর্কিত থাকার কারণে তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কোন শ্রেণীগত অবস্থান গড়ে ওঠে নি। সে অবস্থান তৈরী করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। গ্রামীণ শোষক ও বুর্জোয়া শ্রেণী প্রথম দিকে মুসলিম লীগ ও পরে আইউব খানের শাসন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত ছিল। এ অঞ্চলে যে বাঙালীরা শিল্প ব্যবসা ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরী করছিল তারা ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার কারণে তারা আওয়ামী লীগ রাজনীতির মধ্যে নিজেদের কোন সম্ভাবনা ১৯৬৯-১৯৭০ সাল পর্যন্ত দেখে নি। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের খুঁটিতেই বাঁধা ছিল। পাকিস্তানী শাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল তাতে কমিউনিস্টসহ কিছু কিছু পেটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগই সেই প্রতিরোধের মূল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু এই প্রতিরোধ সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য এমনই ছিল যে, তাতে দেশের উৎপাদনশীল জনগণের প্রতিনিধির পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল লোকজনেরই প্রাধান্য স্থাপিত হয় এবং তাদের প্রতিনিধি হিসেবেই আওয়ামী লীগ নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। নব্য বাঙালী শিল্প ব্যবসায়ী বুর্জোয়া শ্রেণীর আকার ছোট হলেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে শ্রেণী স্বার্থের গাঁটছড়ায় তাদের প্রধান অংশ বাঁধা থাকা এবং এখানকার প্রতিরোধ সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাই ছিল এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর ফলে আওয়ামী লীগের গঠন (Composition) এর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, এই সংগঠনের নেতৃত্ব ছিল পাটের দালাল, বীমার দালাল, উকিল-মোক্তার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র ভূমি মালিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষক, বেকার যুবক ও ছাত্রদের হাতে। নোতুন একটি রাষ্ট্রে ক্ষমতার অধিকারীদের এই ধরনের শ্রেণী চরিত্র ছিল এক অতি ব্যতিক্রমী ব্যাপার। এর তূল্য কোন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

এই বৈশিষ্ট্যের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এর দ্বারাই নোতুন বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের চরিত্র নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৭১ পরবর্তী যা কিছু এ দেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও শিক্ষা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে ঘটেছে তার মূল কারণ এর মধ্যেই নিহিত আছে।



ছয়

রাষ্ট্রের রাজনৈতিক উপরিকাঠামো (Superstructure) তার অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপরই গঠিত হয়। শুধু রাজনৈতিক নয়, রাষ্ট্রের সমগ্র উপরিকাঠামোই মূলতঃ দাঁড়িয়ে থাকে তার অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর। কিন্তু রাষ্ট্র পরিবর্তনের সময় তার মধ্যে যে ভাঙন দেখা যায় তাতে সাময়িকভাবে ভিত্তি এবং উপরিকাঠামোর মধ্যেকার এই সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় যেমন অর্থনীতি রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষেত্রে মৌলিক ও সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তেমনি রাষ্ট্র পরিবর্তনের সময় রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থনীতিসহ অন্য সব ক্ষেত্রের ওপর সব থেকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে। যে রাষ্ট্রবিপ্লবে এক শ্রেণীর পরিবর্তে অন্য শ্রেণীর ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা হয় সেখানে এই পরিবর্তন খুব মৌলিক, ব্যাপক ও গভীর হয় কারণ এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের শ্রেণী চরিত্রই পরিবর্তিত হয়। আবার যেখানে রাষ্ট্রবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা শ্রেণী সম্পর্ক অটুট রেখে ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়, জাতি বা আঞ্চলিক শক্তির হস্তগত হয় সেখানে ভিন্নভাবে ও নিু মাত্রায় একই ব্যাপার ঘটে। বাঙলাদেশে ১৯৭১ সালে এই দ্বিতীয় ধরনের পরিবর্তনই ঘটেছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়ার সময় ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতে হিন্দু প্রধান ভূমি মালিক ও বুর্জোয়া শ্রেণীর কাছে এবং পাকিস্তানে মুসলমান প্রধান ভূমি মালিক ও বুর্জোয়া শ্রেণীর কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল। বাঙলাদেশেও ১৯৭১ সালে এ ধরনের ব্যাপারই ঘটেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকারের এবং পাঞ্জাবী ভূমি মালিক ও বুর্জোয়াদের থেকে ক্ষমতা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের হাতে এসেছিল।

এই বাঙালীরা কারা ছিল? কি ছিল তাদের শ্রেণী চরিত্র? এ প্রশ্ন অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও শাসক শ্রেণীর বিভিন্ন দলের নেতা, তাদের ঘরাণার বুদ্ধিজীবী থেকে নিয়ে কমিউনিস্ট নামধারী বামপন্থীরা কেউই তা উত্থাপন করে নি। ১৯৭১ সালে রাষ্ট্র ও সরকারী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। এই আওয়ামী লীগের শ্রেণী চরিত্র কি ছিল এ প্রশ্ন তো কেউ করেই-নি, উপরন্তু তাদের কোন নির্দিষ্ট শ্রেণী চরিত্র থাকতে পারে, এ ধারণাও অনেক বুদ্ধিজীবীর ছিল না। তাঁরা মনে করতেন আওয়ামী লীগ দেশের স্বাধীনতা এনেছে এবং তারা এমন এক জাতীয় পার্টি যা সকলেরই প্রতিনিধিত্ব করে। কমিউনিস্টরা আওয়ামী লীগের প্রকৃত শ্রেণী চরিত্র অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে তাকে শুধু ভূমি মালিক জোতদার ও পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর দল হিসেবে আখ্যায়িত করে নিজেদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের কাজ সমাধান করতেন। তার মধ্যে ইতিবাচকের থেকে নেতিবাচক উপাদানেরই প্রাধান্য থাকতো।

বাঙলাদেশে ক্ষমতা হস্তান্তর, অর্থাৎ একটি রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে না হলেও একটি অংশে উচ্ছেদ হয়ে যেভাবে অন্য একটি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিল, সে প্রক্রিয়ার কতকগুলি বৈশিষ্ট্য ছিল। এই বৈশিষ্ট্যের সাথে সম্যক পরিচয় ছাড়া বাঙলাদেশ রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র এবং ১৯৭১ পরবর্তী ঘটনাবলীর পরম্পরা বোধগম্য হওয়া সম্ভব নয়।

এই বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৭১ সালের রাষ্ট্র ক্ষমতা হস্তান্তর কোন নির্দিষ্ট শ্রেণী অর্থাৎ উৎপাদনের সাথে সম্পর্কিত শ্রেণী, যেমন ভূমি মালিক, শিল্প ব্যবসা বাণিজ্য মালিকের কাছে হয় নি। এ হস্তান্তর হয়েছিল এমন একটি রাজনৈতিক দলের কাছে, যারা ছিল উৎপাদনের সাথে সম্পর্কহীন, প্রধানতঃ মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারা গঠিত। এদের চরিত্রের বিষয় ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।



সাত

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাঙলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঠিক পর পরই এখানে যা ঘটতে থাকে তার দিকে তাকালেই এই রাষ্ট্রের ক্ষমতা শ্রেণীগতভাবে কাদের হাতে ছিল ও কাদের হাতে ছিল না তার পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম থেকেই চারদিকে লুটপাটের এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। শুধু অবাঙালীদের বাড়ীঘর, জমি, ব্যবসা-বাণিজ্য, আফিস, শিল্প কারখানাসহ সকল প্রকার সম্পত্তিই নয়, সেই সাথে পাকিস্তানীদের সহযোগী ও সহযোগী বলে সন্দেহভাজন বাঙালীদের সম্পত্তিও এইভাবে লুটপাট হতে থাকে। অনেকে শুধু লুটপাট করার জন্যই নিরীহ লোকজনকে পর্যন্ত পাকিস্তানীদের সহযোগী রাজাকার, আল বদর ইত্যাদি হিসেবে অভিহিত করে তাদের সম্পত্তি দখল করে।

যেভাবে এই লুটপাট ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু হয়ে দেশের সর্বত্র দীর্ঘদিন ধরে একইভাবে চলেছিল তার থেকেই বোঝা যায় যে, রাষ্ট্র শক্তির জোরে যারা এ কাজ করছিল তাদের চরিত্র মূলতঃ ল্ণ্ঠুনকারী, যারা কোন উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল না। লুম্পেন চরিত্রসম্পন্ন এই শ্রেণীর লোকরাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও পুরো শরীর গঠন করেছিল।

যারা ১৯৭২ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বাঙলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজ শুরু করেছিল তাদের কর্ম পদ্ধতির সাথে এই লুণ্ঠনজীবীদের কর্মপদ্ধতির ঐক্য সহজেই লক্ষ্যণীয়। আগেই কথা হয়েছে, কিভাবে সংবিধান প্রণয়নের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে একটি নোতুন সংবিধান সভা নির্বাচনের পরিবর্তে তারা পাকিস্তানী আমলে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সভা গঠন করে সংবিধান প্রণয়ন করেছিল। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের বহুকথিত একাত্তরের চেতনাসম্পন্ন নোতুন রাজনৈতিক শক্তিকে নিজেরাই সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে বা বাতিল করে স্বাধীন দেশের সংবিধান প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন করেছিল!

১৯৭২ সালের সংবিধানে কিছু গণতান্ত্রিকক উপাদান ছিল। কাজেই আপাতঃদৃষ্টিতে মনে হয় যে, এই সংবিধানের প্রণেতারা প্রকৃতই গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন ছিলেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছিল যে, যতটুকু গণতান্ত্রিক চরিত্র এই সংবিধানের শরীরে ছিল তার সাথে সংবিধান প্রণেতাদের, বিশেষতঃ আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের শ্রেণীগত চারিত্রিক কোন সম্পর্ক ছিল না। জনগণকে প্রতারিত করার জন্যই সংবিধানে কিছু গণতান্ত্রিক ধারা সন্নিবেশিত হয়েছিল। এ সংবিধান প্রবর্তিত হওয়ার পর অল্পদিনের মধ্যেই তা যেভাবে সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়েছিল তার দ্বারাই নব্য শাসক শ্রেণীর সরকারী দল আওয়ামী লীগ তার প্রতারক চরিত্র উন্মোচন করেছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও চতুর্থ সংশোধনী, বিশেষতঃ চতুর্থ সংশোধনীটি ১৯৭২ সালে গৃহীত সংবিধানের মধ্যে যা কিছু গণতান্ত্রিক উপাদান ছিল তার মূলে কুঠারাঘাত করে তাকে ধ্বংস করেছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ডান হাতে যা দেওয়া হয়েছিল সেটা বাম হাতে অপহরণ করা হয়েছিল। এর থেকে বড় প্রতারণার দৃষ্টান্ত অন্য কোন দেশের সংবিধানের ইতিহাসে নেই।

তবে আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের মধ্যেই সংবিধানের যে দুরবস্থা ঘটিয়েছিল সেটা যে অবশ্যম্ভাবী ছিল এটা আমরা তার খসড়া সংবিধান সভায় প্রস্তাবিত হওয়ার পরই তার ওপর আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছিলাম। ‘আওয়ামী লীগ প্রস্তাবিত সংবিধান’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধে ১৯৭২ সালের ২৯শে অক্টোবর মাসে আমি লিখেছিলাম, “সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্রটিতে রাষ্ট্র পরিচালনা মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হলেও একটা প্রাথমিক বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে যে, বস্তুতপক্ষে এই শাসনতন্ত্রটি উপরোক্ত চারটি মূলনীতির বিরুদ্ধেই সুপরিকল্পিতভাবে পরিচালিত,” (সাপ্তাহিক স্বাধীকার, বদরুদ্দীন উমর, যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ, পঞ্চম প্রকাশ, ১৯৯৭ আফসার ব্রাদার্স, ঢাকা)। এই বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রস্তাবিত সংবিধানের বিভিন্ন ধারা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। দেখানো হয়েছিল, কিভাবে সেগুলোর মধ্যে এমন সব ধারা সংযোজিত হয়েছিল যার দ্বারা মূল নীতিগুলোকে বিধ্বস্ত করার ব্যবস্থাই করা হয়েছিল। সংবিধানের এই পরিণতি ঘটতে দেরী হয়নি। ১৯৭৫ সালের মধ্যেই চারটি সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী-বাকশালী সরকার একটি ফ্যাসিস্ট সরকার হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এর বিস্তারিত বিবরণের মধ্যে যাওয়ার প্রয়োজন আমাদের বর্তমান আলোচনায় নেই, এ আলোচনা বিস্তারিতভাবে অন্যত্র করা হয়েছে।



আট

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭২ সালের সংবিধানকে তার “পূর্ব গৌরবে” প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নানা তৎপরতা দেখাচ্ছে। এ নিয়ে তাদের অর্ধশিক্ষিত নেতানেত্রী থেকে নিয়ে তাদের ঘরাণার বুদ্ধিজীবীরা সভাসমিতিতে কথা বলছেন ও পত্র-পত্রিকায় রচনা লিখছেন। তাঁদের এই কাজ থেকে মনে হয় তাঁরা সত্যিসত্যিই ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানকে তার আদি রূপে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বদ্ধপরিকর!

প্রথমেই বলা দরকার যে, এই চিন্তা যাঁরা করছেন তাঁদের অধিকাংশেরই ১৯৭২ সালের সংবিধানের সাথে পরিচয় নেই। তাঁরা জানেন না যে, ঐ সংবিধানের মূল শরীরে কি ছিল এবং পরে তার থেকে কি কি বাতিল হয়ে সংবিধান বর্তমানে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যা বাস্তবতঃ অকার্যকর হওয়ায় ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাওয়ার হুজুক এখন আওয়ামী মহলে জোরদার হয়েছে। এই সুযোগে এই মহলের ধুরন্ধর লোকেরা বলে বেড়াচ্ছেন যে, জিয়াউর রহমানের সময় কৃত পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যেই সংবিধান তার আদিরূপে বহাল হয়েছে। শুধু কামাল হোসেনের মতো লব্ধপ্রতিষ্ঠিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইনজীবীই নয়, সদ্য নিযুক্ত সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি পর্যন্ত শপথ গ্রহণের পরপরই বলেছেন এই একই কথা!



নয়

এক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বুঝতে হবে তা হলো, ১৯৭২ সালে যে সংবিধান তৈরী করা হয়েছিল তার মধ্যে যা কিছু গণতান্ত্রিক উপাদান ছিল তার সাথে সংবিধান রচয়িতা শ্রেণীর স্বার্থের কোন যোগ ছিল না। উপরন্তু সেই সংবিধানের সাথে সংবিধান রচয়িতাদের যে দ্বন্দ্ব ছিল তার বহিঃপ্রকাশ অল্পদিনের মধ্যেই তাদের কার্যকলাপের মাধ্যমে সামনে এসেছিল। এই দ্বন্দ্বের সমাধান শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী-বাকশালী সরকার করেছিল সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে। কাজেই এই সংশোধনীগুলি নোতুন শাসক শ্রেণীর পক্ষে কোন খেলার ব্যাপার ছিল না। দ্রুত বিকশিত হতে থাকা বাঙলাদেশের লুণ্ঠনজীবী লুম্পেন চরিত্র সম্পন্ন বুর্জোয়া শ্রেণী নিজেদের রচিত সংবিধানের খোলনয়চা পরিবর্তন করে তাদের নিজেদের স্বার্থের উপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এই উদ্যোগের ভেতরে চতুর্থ সংশোধনী ছিল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই সরকার তাদের ১৯৭২ সালের সংবিধানে ঘোষিত রাষ্ট্র পরিচালনার চার নীতির মূলে কুঠারাঘাতের ব্যবস্থা করেছিল। শেখ মুজিবের বাকশালী শাসন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট উচ্ছেদ না হলে তিনি নিজেই চতুর্থ সংশোধনীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আরও অনেক সংশোধনী এনে সংবিধানকে ফ্যাসিস্ট চরিত্র প্রদানের যে প্রক্রিয়া চালু করেছিলেন তা বেশ দ্রুতই আরও এগিয়ে নিতেন।

তবে শেখ মুজিব এ কাজ সম্পন্ন করতে না পারলেও তাঁর পরবর্তী রাষ্ট্রনায়ক ও সরকার প্রধানরা তাঁর আরদ্ধ কাজ সুসম্পন্ন করেছিলেন। এদিক দিয়ে জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী, তাতে বিসমিল্লাহ রাখার ব্যবস্থাসহ অন্য সংযোজন; এরশাদের অষ্টম সংশোধনীতে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম করার ব্যবস্থা ইত্যাদিসহ সব কিছুই ছিল, যা বাঙলাদেশে নোতুনভাবে গঠিত হতে থাকা শাসক শ্রেণীর সাথে সঙ্গতি রেখেই হয়েছিল। আপাততদৃষ্টিতে যতই বিরোধী মনে হোক, পরবর্তী সংশোধনীগুলির মাধ্যমে শেখ মুজিব প্রবর্তিত সংশোধনীগুলির ধারাবাহিকতা অন্যদের শাসন আমলে প্রবর্তিত সংশোধনীগুলির মধ্যে রক্ষিত হয়েছিল। এ কারণে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল নিয়ে আওয়ামী লীগ দল ও তাদের ঘরাণার বুদ্ধিজীবীরা শোরগোল করে একে ১৯৭২ সালের আদি সংবিধানে ফিরে যাওয়ার কথা বললেও এই সংশোধনীতে ‘বিসমিল্লাহ’ রাখার যে ব্যবস্থা হয়েছিল সেটা বাদ না দিয়ে বহাল রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পঞ্চম সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল না করে আংশিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।

জিয়াউর রহমানকে ধর্মনিরপেক্ষতা বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে পঞ্চম সংশোধনীতে বিসমিল্লাহ রাখার বিষয়টিকে আওয়ামীপন্থীরা ইতিপূর্বে সব সময়ই উল্লেখ করে এসেছেন। কিন্তু এখন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের সময় তাঁরা এই অংশ বাতিল না করে বহাল রেখেছেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকবে কারণ এটা বাঙলাদেশের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ!! অর্থাৎ এটা মুসলমানদের দেশ, কাজেই এখানকার ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানে বিসমিল্লাহ থাকা বাস্তব কারণেই প্রয়োজন!!! আসলে এই বাস্তব কারণটি কী? অবশ্যই মুসলমান ভোটারদের ভোট প্রাপ্তির আশা। তবে এই সাথে এটা স্বীকার করতে হবে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিসমিল্লাহ না থাকাটা ছিল তৎকালীন সরকার ও সংবিধান প্রণেতাদের অবাস্তব চিন্তাধারারই পরিচায়ক। এখন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জিয়াউর রহমানের বাস্তব বুদ্ধির সাথে ঐক্যমত পোষণ করেই সংবিধানে বিসমিল্লাহ রাখার ব্যবস্থা বহাল রেখেছে!

আওয়ামী লীগ আরও কিভাবে ধর্মের ব্যবহার করছে তার দৃষ্টান্ত আছে। তারা এরশাদের সময়কার অষ্টম সংশোধনী বাতিলের সম্ভাবনা বাতিল করেছে, যদিও এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাঙলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণা করা হয়েছিল। এই রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষণার সাথে বাঙলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র ঘোষণার যে কোনই পার্থক্য নেই, এটা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এবং তাদের ঘরাণার পদলেহী বুদ্ধিজীবীরা ছাড়া অন্য কারও দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই।

সংবিধানের মুখবন্ধে বিসমিল্লাহ এবং বাঙলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম রাখা সত্ত্বেও তাদের মুখে সব সময়ই ধর্ম নিরপেক্ষতার খৈ ফুটছে। এর কারণ আওয়ামী লীগ সব সময়েই আগা এবং গোড়া দুই খাওয়ারই পক্ষপাতী। তারা ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু তাদের রাষ্ট্র ধর্ম হলো ইসলাম! জনগণের সঙ্গে এত বড় স্বচ্ছ প্রতারণার জন্য কোন বিবেক দংশন তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের তো বটেই, এমনকি তাদের ঘরাণার বুদ্ধিজীবীদেরও নেই। এই প্রতারণা করতে গিয়ে তাদের লজ্জা শরমেরও কোন বালাই নেই।

পঞ্চম সংশোধনী বাতিল প্রসঙ্গে সদ্য নিযুক্ত প্রধান বিচারপতি বলেছেন যে, এর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাঙলাদেশে ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কথা বলেছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচারিত ডক্টর কামাল হোসেন!! কিন্তু কিভাবে এটা হলো?

পঞ্চম সংশোধনী শেখ মুজিবের আমলের চতুর্থ সংশোধনী বাতিল করেছিল। তার আগে চতুর্থ সংশোধনীর কিছু অংশ খন্দকার মোস্তাক বাতিল করেছিলেন এ্যাক্ট বা অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে। চতুর্থ সংশোধনীতে একদলীয় সরকার ইত্যাদি যে সব ধারা ছিল সেগুলি বাতিল করে পঞ্চম সংশোধনী বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তন করেছিল। এখন পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে চতুর্থ সংশোধনী তার ফলে পুনরুজ্জীবিত হবে। চতুর্থ সংশোধনীর মত একটি সংশোধনী কার্যকর হলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরৎ যাওয়া যাবে কিভাবে? কাজেই তার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন হবে শুধু জিয়াউর রহমানের পঞ্চম সংশোধনী নয়, শেখ মুজিবুর রহমানের চতুর্থ সংশোধনীও বাতিল করা। এই দুই কাজই করতে হবে জাতীয় সংসদে, কারণ সংবিধানের সংশোধনের সাংবিধানিক এখতেয়ার আদালতের নেই। শীর্ষ আদালত সাংবিধানিক বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে পারে, কিন্তু নিজে সংবিধান সংশোধন করতে পারে না। প্রধান বিচারপতি যেভাবে বলেছেন যে, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৯৭২ সালের সংবিধান তার আদিরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটা এমন এক ভুল কথা যা দেশের প্রধান বিচারপতির অযোগ্য। শুধু তাই নয়, দায়িত্বভার গ্রহণ করার সাথে সাথে সাংবাদিক সম্মেলন তিনি জানিয়েছিলেন যে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ করেছেন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবিধান নোতুন করে ছাপার!


দশ

সংবিধান সংশোধন, ১৯৭২ সালের আদি সংবিধান পুনরুজ্জীবন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা ইত্যাদি নিয়ে এখন সরকারী মহলে যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তার মূল কারণ বর্তমানে সংবিধান যে অবস্থায় আছে, তাতে এর কোন যথাযথ কার্যকারিতা নেই। সংবিধানকে একটা জগাখিঁচুড়িতে পরিণত করে দেশ জুড়ে সর্বক্ষেত্রে এক শাসন সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। এই সঙ্কট থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টাতেই এখন যে সব কাজ সরকারী দলের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে সংবিধান সংশোধনীর উদ্যোগ তার অন্যতম।

কিন্তু সরকার এ চেষ্টা যেভাবেই করুক, বাঙলাদেশে শাসন সঙ্কট যেভাবে দেখা দিয়েছে তার থেকে শাসক শ্রেণীর উত্তরণ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর মূল কারণ, যে লুণ্ঠনজীবী লুম্পেন শাসক শ্রেণী এখন শাসন ক্ষমতায় রয়েছে তাদের চুরি, ঘুষ, কমিশন, ভূমিদস্যুগিরি, প্রতারণা এবং হাজার রকমের দুর্বৃত্তগিরি সমগ্র সমাজের একটা বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশের এমন অপরাধীকীকরণ করেছে যাতে সমাজের কাঠামো ভেঙে পড়ছে, শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে এবং সমাজের ভিত্তি মূল নড়বড়ে হয়ে এক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের জনগণের সামনে ১৯৭২ সালের আদি সংবিধান পুনরুজ্জীবিত করা, সেই সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি কোন আসল ইস্যু বা লক্ষ্য নয়। তাঁরা নিজেরা যে সঙ্কটের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন তার সাথে সংবিধান সংশোধনীর কোন সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ এটা নিশ্চিতভাবেই বলা দরকার যে, এই বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন মৌলিক সমাজ পরিবর্তন। সেই সমাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নোতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও নোতুন সংবিধান। কাজেই বর্তমান সংবিধান সংশোধন করে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাওয়া নয়। এই সংবিধানকে ফেলে দিয়ে বা উচ্ছেদ করে এক নোতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন ও প্রতিষ্ঠাই বর্তমান সঙ্কট থেকে জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী সংগ্রাম সংগঠিত করাই জনগণের এই মুহূর্তের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় কর্তব্য।

৪.১০.২০১০



[সংস্কৃতি ২০১০ অক্টোবর সংখ্যা থেকে অন্তর্জালে প্রকাশিত dorho.net থেকে সংগৃহিত ]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন