শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০১১

কেন্‌ সারো-ওয়া’র ফাঁসি এবং নাইজেরিয়ার ‘উন্নয়ন’ যাত্রা / আনু মুহাম্মদ

(লেখাটি প্রকাশিত হয় নভেম্বরের ৫ তারিখে, ২০০০ সালে। এটি লেখকের “বাংলাদেশের তেল-গ্যাস: কার সম্পদ কার বিপদ?” এই শিরোনামের গ্রন্থ থেকে শেয়ার করা হলো। গ্রন্থটি ‘জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন’ থেকে ‘জানুয়ারি ২০০২’ সালে প্রকাশিত হয়।)
পাঁচ বছর পুরো হতে চললো। ১৯৯৫ সালের ১০ নভেম্বর নাইজেরিয়ার লেখক-সমাজকর্মী কেন্‌ সারো-ওয়া সহ ৮ জনের ফাঁসি হয়। এর আগে সামরিক সরকার তাদের গ্রেফতার করে যে বিচার করে তা ছিল এই সিদ্ধান্তে আসার জন্য যেভাবে সাজানো দরকার সেভাবে সাজানো।

কোন্ সারো-ওয়া এবং তার সহযোদ্ধাদের অপরাধ কি ছিল? অপরাধ ছিল নাইজেরিয়ার শেল কোম্পানির তেল উত্তোলন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি অঞ্চলে পরিবেশে-এর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিনের চাপা বিক্ষোভকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা। কেন্ কোন বিপ্লবী সংগঠনের কর্মী ছিলেন না। আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার চাওয়ার চেষ্টার জন্যই তাঁকে জীবন দিতে হয়।

শেল-এর বিরুদ্ধে যে ঘটনকে কেন্দ্র করে পরিবেশ ধ্বংস ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের মামলা দায়ের হয় এখন থেকে প্রায় ৯ বছর আগে, সেটি ঘটেছিলো তারও ২০ বছর আগে, ১৯৭০ সালে। ৩০ বছর আগে ঘটনাটি ব্যাপক সংখ্যক এলাকার মানুষকে বিপর্যস্ত করে, পরিবেশ-এর স্থায়ী ক্ষতি করে কিন্তু ক্ষমতাসীনদের চাপের মুখে এ নিয়ে কোন প্রতিবাদ, দাবি উত্থাপন সম্ভব হয়নি। কিন্তু ধামা দিয়ে কি চিরদিনের জন্য সবকিছু চাপা দেয়া যায়? অন্যান্য অঞ্চলে পরিবেশ-মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এই অঞ্চলের ক্ষতি এতই ব্যাপক ছিল যে ‘উন্নয়ন’-এর আওয়াজ তুলে তাকে ঢাকা দেয়া সম্ভব হয়নি। উন্নয়ন-এর প্রতিশ্রুতি শুনে জনগণের পক্ষেও চোখের সামনের বিপর্যয় উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তার ফলে ক্ষোভ ছিল। মরে যায়নি। মুছে ফেলা যায়নি।

কেন্ এটাকে আইনি পথে ‘মানবাধিকার’ রক্ষার প্রচলিত ধারার মধ্যে দিয়েই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। তারপরও তাঁকে ফাঁসিতে যেতে হল। সামরিক সরকারের পক্ষে অজুহাত তৈরি অনেক সহজ, সে কারণে গ্রেপ্তার ও দ্রুত ফাঁসির ব্যবস্থা স্বচ্ছন্দে করা সম্ভব হয়েছে।

১৯৯৮ সালে প্রেসিডেন্ট আবাচা’র মৃত্যুর পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাতে বিষয়টি আবারো সামনে আছে। নাইজেরিয়ায় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায় শেল-এর ধ্বংসযজ্ঞ বিরোধী আন্দোলন। এই বছরের এপ্রিলে কেন্‌-এর রূপক শেষকৃত্যানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। জুন-এ হাইকোর্ট ৯ বছরের সেই মামলার রায়ে শেল-কে ৮ কোটি ডালার ক্ষতিপূরণের জন্য নির্দেশ দেয়।

সরকার পরির্বতন হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার ভিত্তিতে ধারাবাহিকতা আছে। শেল-এর সর্মথক গোষ্ঠী, সুবিধাবাদী সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী সব গ্রুপের মধ্যে বিস্তৃত আছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাবে ও চাপে আইনি একটি বিজয় অর্জন করেছেন নাইজেরিয়ার জনগণ। কিন্তু তাকে আরও এগিয়ে নেবার অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি বলে এখনও শেল-এর পক্ষে ৩০ বছর আগের ঘটনা নিয়ে আরও দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি সম্ভব হচ্ছে।

এবং সম্ভব হচ্ছে ৩০ বছর আগরে একটি ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াও আরও অসংখ্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, লুণ্ঠন, পাচারের ঘটনা ও প্রক্রিয়াকে আড়াল করা। কেবল কেন্‌ সারো-ওয়া এবং তার কয়েকজন সহযোগীই নাইজেরিয়ায় বহুজাতিক তেল কোম্পানির আগ্রাসনের শহীদ নন। ৭০, ৮০ ও ৯০ দশক জুড়ে এদেশের বিপুল তেল সম্পদের ওপর বহুজাতিক কোম্পানিসমূহের দখল নিশ্চিত করবার জন্য সামরিক শাসন, নির্যাতন ও গণহত্যার যে ধারাবাহিকতা চলে তার বলিদেরকেও তেল কোম্পানির ধ্বংসযজ্ঞ বিরোধী লড়াই-এর শহীদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাঁরা ১, ২, ১০, ১০০ নন, অগণন।

৭০ দশকে নাইজেরিয়ার জনগণও এই কথাটি শুনেছেন, হয়তো বিশ্বাসও করেছেন যে, তেল কোম্পানি তাদের ভাগ্য খুলে দেবে। এই তেল বেচেই সে দেশ হয়ে উঠবে ‘আমেরিকা’, ‘ইউরোপ’। এই বিশাল ‘উন্নয়ন’ কাজের মধ্যে গণ্ডগোল এতই ছিল যে, বহুজাতিক তেল কোম্পানিকে –

(১) তথ্য প্রবাহের ওপর কঠিন নিয়ন্ত্রণ স্থাপন দরকার করতে হয়েছে;
(২) পুরো প্রক্রিয়ায় জনগণের কোন রকম প্রবেশাধিকার যাতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হয়েছে, বলপ্রয়োগের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করতে হয়েছে;
(৩) সবোর্চ্চ মুনাফা নিশ্চিত করবার মত চুক্তি ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন মতো করবার জন্য চরম দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতাবানদের বলয়কে সমর্থনদান ও তাকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হয়েছে; এবং
(৪) উন্নয়ন, সম্পদ ও নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে ভুল ধরনা, তথ্য বিভ্রাট, মিথ তৈরি করে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

এবং এই কাজগুলো নিশ্চিত করবার জন্য অতীব প্রয়োজনীয় শর্ত হচ্ছে এমন ধরণের শাসন ব্যবস্থা যাকে এক কথায় বলা হয় স্বৈরতন্ত্রী; যেখানে একটি ক্ষুদ্রগোষ্ঠী তার প্রবল জবরদস্তিমূলক ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিজেদের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করবে এবং সেই কর্তৃত্বের ঘেরাটোপের মধ্যে নিশ্চিন্তে বসবাস করবে বহুজাতিক কোম্পানি-তেল-গ্যাস কোম্পানি ইত্যাদি। এই ব্যবস্থা হতে পারে সামরিক শাসন, হতে পারে রাজতন্ত্র, হতে পারে বেসামরিক একচেটিয়া শাসন। এই জবরদস্তির প্রয়োজন বাড়ে প্রতিরোধের সম্ভাবনা বাড়লে। আর যদি বুদ্ধিজীবী, সংবাদমাধ্যম, রাজনীতিবিদদের মধ্যে শক্তিশালী লুম্পেন দালাল গোষ্ঠী তৈরি করা সম্ভব হয়, তাহলে জবরদস্তির পাশাপাশি এটি লুণ্ঠন-পাচারের জন্য আরো নিশ্চিত অবস্থা তৈরি করে।

সে জন্য আমরা যদি তালিকা তৈরি করি দেখবো যেসব দেশে তেল-গ্যাসসহ খনিজ সম্পদের ওপর বহুজাতিক সংস্থার একক আধিপত্য আছে, সেখানেই তার সঙ্গে যুক্ত আছে চরম দুর্নীতিবাজ, নির্যাতক, বিপুল সম্পদশালী, দখলদার, সম্পদ পাচারকারী দেশী পক্ষ। এই দেশী পক্ষে কোথাও আছে রাজতন্ত্রী শক্তিসমূহ, কোথাও জেনারেল-আমলা-রাজনীতিবিদ চক্র। তাই মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্রী ব্যবস্থা, আফ্রিকায় বিভিন্ন ধরনের স্বৈরতন্ত্রী ব্যবস্থার সঙ্গে বহুজাতিক সংস্থাসমূহ এবং সেই সূত্রে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী কেন্দ্রীয় বা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সখ্যতা কোন ‘কূটনৈতিক’ ব্যাপার নয়, খুবই জৈবিক ব্যাপার।

মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বের তেল সম্পদের প্রায় অর্ধেক মজুদ থাকবার সঙ্গে এ অঞ্চলে রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সকল শক্তির সম্মিলিত চেষ্টা প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। রাজ-বাদশা-শেখ-আমিররা ধর্মকে বর্ম করে টিকে আছে এদেরই আশীর্বাদে।

মধ্যপ্রাচ্যে রাজা-বাদশাহদের কিংবা আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা-এশিয়ার মদদপুষ্ট জেনারেল-আমলাদের গণহত্যা, নির্বর্তন কোন কিছুই একই করণে পশ্চিমী প্রচার মধ্যমে বিশ্লেষণের জায়গা পায়না, অধিকাংশ ঘটনা অন্ধকারে ঢাকা পরে যায়। ইরাক, ইরান, ইন্দোনেশিয়াসহ বহু দেশে নির্বাচিত সরকার উচ্ছেদ করে স্বৈরতন্ত্রী সরকার প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার ভূমিকা তাই বিচ্ছিন্ন বা বিচ্যুত ঘটনা নায়। তেল কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানিকে এগুলোর সাথে সাথেই পাওয়া যাবে।

নাইজেরিয়া, অন্যান্য দেশের মত, এই প্রক্রিয়ায় জন্ম দিয়েছে বেশ কিছু দানব। বিশাল সম্পদশালী একটি দেশকে কিভাব ছিবড়ে বানিয়ে দিতে হয়, তার স্পষ্ট একটি দৃষ্টান্ত নাইজেরিয়া। দানবেরা খুনি, মাফিয়া এবং বিশাল সম্পদশালী। তাদের অফুরান সম্পদ নাইজেরিয়া থেকে দ্রুত পাচার হয়ে পশ্চিমের ব্যাংক, বীমা, শেয়ার মার্কেট, স্থাবর সম্পদের ব্যবসাকে চাঙ্গা করেছে। পাচার অব্যাহত রাখবার জন্য দেশে গণহত্যা, নির্যাতন দিনে দিনে বেড়েছে। নির্লজ্জ বীভৎস চিত্র: হীন-দীন কোটি মানুষ এবং বিপুল সম্পদশালী কিছু সংখ্যক দানব। আর এই দানবের শরীরের শিরা-উপশিরা, চক্ষু, মগজ দিয়ে প্রবাহিত স্পন্দনে ছন্দময় লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার শেষ মাথায় ফুলে-ফেঁপে উঠেছে শেল কোম্পানি। আন্তর্জাতিক পুঁজির গতি বেড়েছে, মূলধন সংবর্ধন ঘটেছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন রিপোর্টে বিনিয়োগ হিসেবে স্ফীতি হয়েছে। আর প্রচারে, বিজ্ঞাপনে শেল উপস্থিত থেকেছে উন্নয়নের-পরিবেশ রক্ষার অন্যতম নায়ক হিসেবে!

পুরো আফ্রিকা শুধু তেল নয়, অন্যান্য খনিজ সম্পদের দিক থেকেও বিশ্বের অন্য যে কোন অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি সমৃদ্ধ। সম্পদ যদি বেশি থাকে এবং সেই সম্পদের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মতো রাজনৈতিক ব্যবস্থা যদি না থাকে তাহলে সম্পদ কিভাবে আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপে পরিণত হয়, তা বোঝার জন্য আফ্রিকার দিকে তাকানো খুব দরকার। তেল, সোনা, হীরার বিপুল মজুত একদিকে, অন্যদিকে দারিদ্রের স্থায়ী উপস্থিতির চিত্র পাশাপাশি যে স্থির হয়ে আছে তা নয়, সেই মজুত দখল ও পাচারের মধ্য দিয়ে দারিদ্রের চেহারা আরও বীভৎস হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে ঐ দেশের মধ্যে একটি দুঃশাসনের অচলায়তন এবং তার ওপর মাফিয়া গোষ্ঠীর ক্ষমতা।

এই প্রক্রিয়া তাই – প্রচলিত ‘উন্নয়নের অর্থশাস্ত্রের’ প্রতারণারও একটি চেহারা, যেটি লুণ্ঠন, পাচার ও দানব সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ‘বিদেশী বিনিয়োগ’, ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং আড়াল করে ধ্বংস, অপচয় ও পাচারের জৈবিক সম্পর্কগুলো।

এসব আড়ালের পেছনে ক্রমাগত পতনের মধ্যে দিয়ে নাইজেরিয়া অন্য অনেক দেশের মত ধুকছে – প্রতারণামূলক ভাবে তাকে ‘উন্নয়ন মডেল’ হিসেবে দেখানোর অবস্থাও আর নেই। মাথাপিছু আয় দেখিয়ে অনেক প্রতারণা হয়। কিন্তু অন্য আর সব সূচক বাদ দিয়ে যদি শুধু ‘মাথাপিছু আয়’ দিয়েই নাইজেরিয়াকে বিবেচনা করি তাহলেও তার শরীর যে কিভাবে শুকিয়ে আসছে, কিভাবে রক্তশূন্য জিরজিরে অবস্থার দিকে দ্রুত এগুচ্ছে একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল, তা বোঝা যাবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব থেকেই আমরা দেখি ১৯৭৭ সালে নাইজেরিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ৪২০ ডিলার, থাইল্যান্ডের সমান। সে সময় শ্রীলংকায় ছিল ২০০ এবং বাংলাদেশে ৯০। ১৯৮৩ তে সামরিক শাসন জারির সময় নাইজেরিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ৭৭০ ডলার, বাংলাদেশে তখন ১৩০। প্রধানত শেল-এর নিয়ন্ত্রণে তেল উৎপাদন ও রফতানি এদেশে সে সময় থেকে বাড়ে এবং মোট রাজস্ব আয়ে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ দাড়ায় তেল থেকে প্রাপ্ত আয়। তেল উত্তোলন ও বিক্রি প্রসঙ্গে যে হিসাব নাইজেরিয়ার সরকারি দলিলে পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে বরাবরই সন্দেহ থেকেছে। এই অসঙ্গতি এতটাই ছিল যে, মাঝে মধ্যে উত্তোলিত তেলের শতকরা ৫০ ভাগের হিসাব নিয়েই গরমিল দেখা যেতো। সামরিক শাসন সব গরমিল ধামাচাপা দেবার জন্য খুবই উপযোগী ব্যবস্থা। নাইজেরিয়াতেও তা কার্যকর থেকেছে।

একদিকে তেল থেকে বিপুল আয়, অন্যদিকে অর্থনীতিতে সংকট বৃদ্ধি, মুদ্রামান হ্রাস, মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি ৮০ দশকেই নাইজেরিয়াকে বিপর্যস্ত করে ফেলে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের বিপরীত দকে বহুজাতিক তেল কোম্পানি ও দেশীয় দানবদের স্ফীতিলাভ চলছিল একটানা। এই প্রক্রিয়ার ১৯৯১ সালে সেখানে মাথাপিছু আয় ৭৭০ ডলার থেকে হয় ৩৪০ এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত বছর নাগাদ এর পরিমাণ হয় ৩০০ ডলার। অর্থাৎ ‘বিদেশী বিনিয়োগে’র পরশপাথর ছোঁয়ায় তেল উৎপাদনের সোনালি ভবিষ্যতে যাত্রা করে নাইজেরিয়ার মাথাপিছু আয় দুই দশকে শতকরা ৪০ ভাগে এসে ঠেকেছে। অথচ একই সময়ে বহু যুদ্ধ সংঘাত সত্বেও শ্রীলংকার মাথাপিছু আয় বেড়েছে শতকরা ৪০০ ভাগ। এবং বাংলাদেশ দারিদ্র ও নির্ভরশীলতার কেস স্টাডি হিসেবে বিবেচিত হয় সেখানেও মাথাপিছু আয় গিয়ে পৌঁছেছে ১৩০ থেকে প্রায় ৩৫০ ডলার। বাংলাদেশ এখন গুছিয়ে গ্রহণ করতে যাচ্ছে নাইজেরিয়ার পথ।

নাইজেরিয়ার এই অবস্থা কি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা? পুরো আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকা বিবেচনা করলে আমরা দেখবো, না। নাইজেরিয়া কোন ব্যতিক্রম নয়। নাইজেরিয়া একই মডেল’এর অন্তর্ভুক্ত একটি দৃষ্টান্ত। জনগণকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা এবং এক পর্যায়ে কেন্‌ সারো-ওয়া’র মত প্রতিবাদী কণ্ঠকে ফাঁসি কাষ্ঠে উঠানো এই মডেল’এরই অন্তর্গত বিষয়।


(আমার নোট: ২০০০ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়া আনু মুহাম্মদের এই লেখাটি প্রায় ১১ বছর পর বর্তমান সময়েও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে হাজির হয়েছে। বিশেষ করে ১৬ জুন ‘মডেল পিএসসি ২০০৮’ এর অধীনে মার্কিন কোম্পানি ‘কনোকফিলিপসে’র সাথে ‘পেট্রোবাংলা’র চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে আমাদের সমুদ্রের ২টি গ্যাস ব্লক – ১০ ও ১১ নং; মার্কিন কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হলো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরণের চুক্তি নতুন কিছু নয়। আমরা জানি এর আগেও এমন চুক্তির আওতায় বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে স্থলভাগের গ্যাস ব্লক তুলে দেওয়া হয়েছিলো। তাহলে ‘কনোকোফিলিপসে’র সাথে এই চুক্তির নতুন দিকটি কোনটি?

নতুন দিকটি হলো, জনগণের সচেতন-দেশপ্রেমিক অংশটির প্রতিবাদ, প্রতিরোধের চেষ্টা, দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি প্রদান, মানুষের মাঝে চুক্তির বিভিন্ন শর্তাদি নিয়ে আলাপ-আলোচনা ইত্যাদি। এর ধারাবাহিকতায় ৩ জুলাই ‘তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্ধর রক্ষা জাতীয় কমেটি’র আহ্বানে ঢাকা শহরে অর্ধদিবস হরতাল পালিত হয়। তৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার এই হরতালে প্রতিরোধে যে ফ্যাসিস্ট ও আগ্রাসী তৎপরতা চালায় তার লাঠিয়াল বাহিনীর দ্বার, সেইটি। এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে এইটাই প্রমাণ হয়, জাতীয় সম্পদ রক্ষার ইস্যুতে জনগণের  ব্যাপক অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে এবং এইটি গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হবে। আর আমাদের দেশের মেরুদণ্ডহীন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সরকার সেই ভয়ে ভিত।

নাইজেরিয়াতে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে জনগণ অংশগ্রহণ করেছিলো, এবং কত মানুষ যে শহীদ হয়েছিলো, তার কোন সঠিক হিসাব নাই। বাংলাদেশেও নিশ্চয়ই জনগণ তার চাইতেই তীব্র এবং সফল আন্দোলন গড়ে তুলে এই লুটেরা-বহুজাতিকদের সকল তৎপরতা বন্ধ করে দিবে, এবং একই সাথে এই দেশে বহুজাতিকদের দালাল, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরকেও প্রতিহত করে ইতিহাসের আস্তকুড়ে নিক্ষেপ করবে। এই প্রত্যাশা করে, এবং আগামী দিনে জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াই-সংগ্রামে সকল দেশপ্রেমিক বন্ধুদেরকে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে এই লেখাটি শেয়ার করলাম। সেই সাথে নাইজেরিয়ার লেখক-সমাজকর্মি শহীদ ‘কেন্‌ সারো-ওয়া’ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সেই সকল শহীদেরকে স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানাই, যারা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফার অগ্রাসন থেকে মানুষ-পরিবেশ রক্ষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।)

সোমবার, ৪ জুলাই, ২০১১

'আমরা পারব না'--এই হীনম্মন্যতাই বড় বাধা / আনু মুহাম্মদ

তারিখ: ২১-০৬-২০১১
১৯৯৭ থেকে ২০০৪ সময়কালে দেশের গ্যাস-সংকট জিইয়ে রেখে মার্কিন কোম্পানির মালিকানায় ভারতে গ্যাস রপ্তানির পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা ছিলকতিপয় মন্ত্রী, আমলা ও কনসালট্যান্ট সব ভুতুড়ে তথ্য দিয়ে দেশবাসীকে বোকা বানাতে দিনকে রাত করেছেনতাঁরা বলেছেন, 'বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে', 'গ্যাস রপ্তানি করলে উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভেসে যাবে' ইত্যাদিমার্কিন-ভারত দূতাবাস, বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বহু সংস্থা এই প্রচারণায় তখন শামিল হয়েছিল কিন্তু স্বাধীন ও দায়িত্বশীল বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় মোকাবিলা এবং জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে লংমার্চসহ ধারাবাহিক আন্দোলনের কারণে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস রপ্তানির এই অপচেষ্টা ভণ্ডুল হয়ে যায়তারা এই কাজে সক্ষম হলে দেশে গ্যাস ও বিদ্যু-সংকট কী ভয়ংকর চেহারা নিত, তা চিন্তা করাও ভীতিকরসে সময় যাঁরা ভুতুড়ে তথ্য দিয়ে দেশের সর্বনাশ করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তাঁদের কোনো শাস্তি হয়নিবরং পরে অনেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেনতাঁদেরই অনেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রপ্তানিমুখী উপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি-২০০৮) প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন২০০৮ থেকেই এই পিএসসির অসংগতি, জাতীয় স্বার্থবিরোধী ধারা এবং এর বিপদ সম্পর্কে দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেনজাতীয় কমিটি শুরু থেকেই যুক্তি, তথ্য, বিশ্লেষণসহ এর প্রতিবাদ করে এসেছে
কিন্তু এসব তথ্য, যুক্তি, বিশ্লেষণ অগ্রাহ্য করে এই পিএসসি-২০০৮-এর কাঠামোতেই বাংলাদেশ সরকার ১৬ জুন বঙ্গোপসাগরের দুটো ব্লকের (১০ ও ১১) গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য কনোকোফিলিপস নামের একটি মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেছেচুক্তির কারণে (১) ১৫.৫.৪ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ যদি সমুদ্রের ১৭৫ মাইল দূরের গ্যাসক্ষেত্র পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহন ব্যবস্থা (পাইপলাইন) স্থাপন করে, তাহলে পেট্রোবাংলা তার অংশের প্রফিট গ্যাস রাখার অধিকারপ্রাপ্ত হবেতবে তা কোনোমতেই মোট প্রাপ্ত গ্যাসের ২০ শতাংশের বেশি নয়অর্থা ৮০ শতাংশের মালিকানা কস্ট রিকভারি ও প্রফিট শেয়ারিং নানা কূটচালের মাধ্যমে কনোকোফিলিপসের হাতেই থাকবে, এটা নিশ্চিত করা হয়েছে
উল্লেখ্য, যে পাইপলাইন তৈরি করে বাংলাদেশকে তার প্রাপ্য গ্যাস আনতে হবে, তার খরচ (৩৫০ মিলিয়ন ডলার) কনোকোফিলিপসের প্রাথমিক বিনিয়োগের (১১০ মিলিয়ন ডলার) তিন গুণেরও বেশি। (২) ১৫.৫.১, ১৫.৫.৪, ১৫.৫.৫, ১৫.৬ ধারায় বর্ণিত শর্ত সাপেক্ষে কনোকোফিলিপস ১৫.৫.২ ধারায় বর্ণিত হিসাব অনুসারে চুক্তিকৃত এলাকায় উপাদিত বাংলাদেশের অংশসহ যেকোনো পরিমাণ 'মার্কেটেবল গ্যাস' এলএনজি (তরলায়িত) করে রপ্তানির অধিকার পাবে। (৩) কনোকোফিলিপস বাংলাদেশকে গ্যাস কেনার আহ্বান জানাবে ঠিক, কিন্তু বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম তাঁর এক লেখায় ('পিএসসিতে ৮০ শতাংশ গ্যাস রপ্তানির সুযোগ দেশের স্বার্থবিরোধী', প্রথম আলো, ৭ জুলাই ২০০৯) সব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, যে দামে কনোকোফিলিপস গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে, তা বাংলাদেশে তাদের গ্যাস বিক্রির দামের কমপক্ষে প্রায় তিন গুণ হবে অবস্থায় গ্যাস রপ্তানির এ ধরনের লাভজনক প্রস্তাব অনুমোদনে তারা যা করা দরকার তাই করবে। (৪) কেয়ার্ন এনার্জি দেখিয়েছে, কীভাবে অবাধে খরচ ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি দেখিয়ে গ্যাসের পুরো মালিকানা নিয়ে নিতে হয়সানটোস ও শেভরনের সাম্প্রতিক তপরতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাদের কাছ থেকে আমাদের গ্যাসের ক্রয়মূল্য বাড়ছে, সামনে আরও বাড়বেসুতরাং গভীর সমুদ্র থেকে কনোকোফিলিপস আমাদের গ্যাস সেই দামেই বিক্রি করতে রাজি হবে, যার খরচ আমদানিমূল্য থেকেও বেশি হবেতখন 'উন্নয়ন সহযোগী' আর কনসালট্যান্টরা রপ্তানির পক্ষেই প্রচারণায় লিপ্ত হবেন। (৫) রপ্তানির চাপ তৈরি হবে আরও এই কারণে যে, ১৫.৪ ধারা অনুযায়ী সাধারণভাবে অনুমোদিত সীমার (প্রমাণিত মজুদের ৭.৫ শতাংশ) অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনে কোম্পানিকে অধিকার দেওয়া আছে অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করলে এই পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব যে, বাংলাদেশ এটা কিনতে পারবে না, অতএব রপ্তানিই যৌক্তিক হয়ে দাঁড়াবে
১৯৯৩-৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্থাকে ক্রমান্বয়ে প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে একের পর এক বিদেশি কোম্পানির হাতে স্থলভাগের সমৃদ্ধ ব্লকগুলো তুলে দেওয়া হয়এর পেছনে যে দুটো যুক্তি প্রধান ছিল, সেগুলো কনোকোফিলিপসের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তির পেছনেও আমরা শুনতে পাইএগুলো হলো: ১. পুঁজির অভাব এবং ২. দক্ষতা ও প্রযুক্তির অভাবকিন্তু গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির কারণে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে ৩০ গুণ বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের নিজেদেরই গ্যাস কিনতে হয়েছেএর ফলে যত টাকার অভাব বলে বিদেশি কোম্পানির হাতে গ্যাসসম্পদ তুলে দেওয়া হলো, তার প্রায় দশ গুণ বেশি, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা এখন ভর্তুকি দিতে হয় প্রতিবছর
দ্বিতীয়ত, দক্ষতার কথা বলে আনা হলেও মার্কিন ও কানাডীয় কোম্পানির হাতেই মাগুরছড়া ও টেংরাটিলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে ধ্বংস হয়েছে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসএর আন্তর্জাতিক বাজারদর এখন প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা সরকারের পর সরকার গেছেকেউ এই ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নিএই অভিজ্ঞতার মুখেই আমরা কনোকোফিলিপস সম্পর্কে ভীতিকর তথ্য পাচ্ছি কনোকো ও ফিলিপস এক হওয়ার আগেও তাদের দুর্ঘটনার রেকর্ড ছিলপরেও তা অব্যাহত আছে২০০৪ ও ২০০৬ সালের পর ২০০৮ সালে তারা দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটায় সর্বশেষটি আলাস্কায়, এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্লোআউটএ রকম একটি কোম্পানির হাতে বঙ্গোপসাগরের দুটি গ্যাসব্লক তুলে দেওয়ায় ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়ল শুধু ওই দুটি ব্লক নয়, বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্যও
অনেকে বলছেন, এর বিকল্প কী ছিল? ভারত-মিয়ানমার তাদের অংশে অনুসন্ধান শুরু করেছে, আমরা না করলে তো বিপদবাস্তবে যা ঘটল, এই চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে ভারত ও মিয়ানমারের দাবি মেনে নেওয়া হলো আর বাংলাদেশের অংশ তুলে দেওয়া হলো মার্কিন কোম্পানির হাতেঅনেকে বলছেন, আমাদের তো ক্ষমতা নেই, প্রযুক্তি নেই, পুঁজি নেইএই প্রচারণাও হীনম্মন্যতা, দখলদারি বিস্তারের প্রধান অবলম্বনআগেই দেখিয়েছি, প্রাপ্তির তুলনায় পুঁজির পরিমাণ নগণ্যপ্রযুক্তি বা দক্ষ জনশক্তির অভাব পূরণে সাবকন্ট্রাক্ট দেওয়া বা প্রবাসী বা বিদেশি বিশেষজ্ঞ কাজে লাগানোয় কোনো অসুবিধা নেইবাংলাদেশ তার মালিকানায় জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বেই যদি এই কাজ শুরু করত, তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হতোএই গ্যাস নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন জীবন দান করত, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম থাকত, জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো, সর্বোপরি হীনম্মন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি নির্মাণ করতে পারত
বাংলাদেশে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যু-সংকট, বাসভাড়াসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান হারে গ্যাস ও বিদ্যু খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, শিল্প খাতে সংকট, কৃষি ও শিল্প খাতে উপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খনিজ সম্পদ ঘিরে দেশি-বিদেশি মাফিয়া গোষ্ঠীর তপরতা বৃদ্ধির পেছনে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি এবং আরও দখলি স্বত্ব প্রতিষ্ঠার অপতপরতাই দায়ীসরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থবিরোধী নীতি ও চুক্তির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে কোনো অনৈক্য দেখা যায় নামার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, রাশিয়াসহ দেশি-বিদেশি লুটেরাগোষ্ঠী বাংলাদেশকে ভাগবণ্টন করে নেবে আর দেশের মানুষ দারিদ্র্য এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বিপর্যস্ত হবেএটা আমরা মেনে নিতে পারি না
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি
[প্রথম আলোর ওয়েব সাইটের সৌজন্যে]

তেলের বিনিময়ে অস্ত্র / জন চেরিয়ান

পশ্চিম এশিয়া তথা আরব বিশ্বের তেল বিক্রির বিপুল অর্থ পুনরায় চলে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দুনিয়ায়। এই চক্রে তেল ও অর্থ দুই-ই হারায় আরবীয় জনগণ। ফুলেফেঁপে ওঠে আরব বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকজন স্বৈরশাসক, তেল ও অস্ত্র ব্যবসার কতিপয় দালাল এবং পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনীতি। ফ্রন্টলাইনে প্রকাশিত জন চেরিয়ানের নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন অরণ্য রাওল

আরব বিশ্বের রাজপথগুলো যখন ওই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করার দাবিতে প্রকম্পিত, পশ্চিমা দেশগুলো তখন একই এলাকায় হাজার হাজার কোটি ডলারের ব্যবসা খোঁজায় ব্যস্ত। মিসর, তিউনিসিয়া, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বিক্ষোভরত প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত ও সরবরাহকৃত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ ও ছত্রভঙ্গকারী টিয়ার গ্যাস শেল আর রাবার বুলেটের মতো অস্ত্রশস্ত্র। পশ্চিম এশিয়ার তেল রফতানিকারক দেশগুলোর শাসকরা বহুদিন ধরেই অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ক্রয়ের পেছনে হাজার হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে আসছে। নিজেদের অর্থনীতিকে দুরবস্থার মধ্যে ফেলে দিয়ে এসব অস্ত্রশস্ত্রের বেশিরভাগই কিনেছে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। তাদের এই অতিমাত্রায় পাশ্চাত্যঘেঁষা নীতি ও প্রবণতাই ওই অঞ্চলজুড়ে চলমান বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছে। অস্ত্র উৎপাদনকারী বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গী করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো সফর করেছেন।
বিস্ফোরণে উত্তাল একটি অঞ্চলে উচ্চপ্রযুক্তির সমরাস্ত্র বিক্রির চেষ্টা করছেন বলে ক্যামেরনের মনের মধ্যে কিন্তু এতটুকু অপরাধবোধ জন্ম নেয়নি। বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা গুলি চালিয়েছিল বলে ফ্রান্সের সঙ্গে ব্রিটেনও সম্প্রতি বাহরাইন এবং লিবিয়ার কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারীদের সবচেয়ে বড় বাজারটি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পেট্রোডলারের মালিক উপসাগরীয় অঞ্চলের শেখ ও আমির শাসিত দেশগুলো। প্রতিবেশীদের জন্য ইরানকে একটি কাল্পনিক হুমকি হিসেবে দাঁড় করিয়ে ২০০৬-০৯ সময়কালে যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে অন্তত ৫০০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ওবামা প্রশাসন মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছিল, ২০০৯-১০ সময়কালে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে ১০০০০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করতে পারার সুযোগ রয়েছে।
মিসর সরকার ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র কিনেছিল। ইসরাইলের পর মিসরই হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় দেশ যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সামরিক সাহায্য পেয়ে থাকে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কালে মিসর ১০৪০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্রশস্ত্র কিনেছে। সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত তিউনিসিয়ার জাইন আল আবিদিন বেন আলি সরকার ২০০৯ সালে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারেরও অধিক মূল্যের সমরাস্ত্র কিনেছিল। গণআন্দোলনে উত্তাল আরেক দেশ জর্ডানও গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৪৩ কোটি ১০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের অস্ত্র কিনেছে। ক্ষুদ্র দেশ বাহরাইনও যেখানকার মানুষ ফেব্রুয়ারি থেকেই সোচ্চার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ১০ কোটি ডলারের অস্ত্র কিনেছে। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহের এক মাঝরাতে রাজধানী মানামার পার্ল স্কয়ার এলাকায় অভিযান চালিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে শামিল জনসাধারণের ওপর এসব অস্ত্রের কোনো কোনোটি ব্যবহারও করা হয়েছে। মার্কিন সৈন্যরা ২০০৩ সালে ইরাক দখল করে নেওয়ার পর থেকে সেখানে এ পর্যন্ত ৩৫০ কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রয় করা হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত আগামী আট বছরের মধ্যে সমরাস্ত্র ক্রয়ের পেছনে ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ১০০০ কোটি ডলার মূল্যের সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মোট অস্ত্র বিক্রির তিন ভাগের এক ভাগই বিক্রয় করে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর কাছে। আর এদের মধ্যে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ক্রেতা। গত বছরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছে ৬০০০ কোটি ডলারের বিশাল অংকের সমরাস্ত্র বিক্রি করে। এসবের মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক সামরিক যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা সিপরি এবং জাতিসংঘের হিসাব মতে, ২০০১ থেকে ২০০৮ সময়কালে সৌদি আরব সামরিক ক্রয় খাতে মোট ৩ হাজার ৪৯০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এই পরিমাণ একই সময়কালে প্রতিরক্ষা খাতে চীন ও ভারতের মোট ব্যয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তেল বিক্রি করে সৌদি আরব যে আয় করে তার বড় একটি অংশ মার্কিন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনা বাবদ খরচ হয়ে যায় এবং এর পরিমাণ হাজার হাজার কোটি ডলার। পশ্চিম এশিয়া সম্পর্কে বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে এমন একজন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা রবার্ট বায়ের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি রাজতন্ত্র সম্পর্কের অকথিত অংশটি হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কাছ থেকে তেল কেনার বিনিময়ে তাকে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা প্রদান করে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক-সামরিক বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এন্ড্রু সাপিরো সম্প্রতি এ মর্মে মন্তব্য করেছেন যে, সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করার অর্থ হলো সৌদি রাজতন্ত্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্কটিকে আরো শক্তিশালী করা। এর মাধ্যমে দেশটির তেল অবকাঠামোয় নিরাপত্তা আরো শক্তিশাল হবে যা আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
পেট্রোডলার প্রদান করে সেটি আবার চক্রাকারে পশ্চিমাদের কাছেই ফিরিয়ে নেওয়ার লাভজনক এই প্রক্রিয়াটি ওয়াশিংটন এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতেও কার্যকর করেছে। পশ্চিমা দেশগুলো মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে বিশ্বমঞ্চে পুনর্বাসিত করার পর নিকট অতীত ২০০৯ সালেই যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়াতেও চক্রাকারে পেট্রোডলার ফেরত নেওয়ার এ প্রক্রিয়াটি চালু করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো এককভাবেই ২০০৯ সালে গাদ্দাফিকে ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি পরিমাণ মূল্যের সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে।
লিবিয়ার কাছে পাশ্চাত্যের অস্ত্র বিক্রয় নিষেধাজ্ঞা ২০০৪ সালে তুলে নেওয়া হয়। তবে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল বিদ্রোহী সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিবিয়ায় একটি ‘নো ফ্লাই জোন’ কার্যকর করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ত্রিপোলিতে অবস্থিত গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই অর্থনৈতিক ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। অন্যদিকে বেনগাজিতে অবস্থানরত বিদ্রোহীদের অস্ত্র এবং অর্থ সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমান সময়ে পশ্চিম এশিয়াই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিকায়িত অঞ্চল। তবে এ অঞ্চলের মানুষই হচ্ছে আবার সবচেয়ে নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী। পাশ্চাত্যের সঙ্গে এই অঞ্চলের কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকদের সখ্যই অস্ত্র ব্যবসাকে ফুলেফেঁপে উঠতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। ব্রিটিশ অস্ত্র কোম্পানি বিএই সৌদি আরবের কাছে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির জন্য সৌদি কর্মকর্তাদের ঘুষ প্রদান করেছিল। এই ঘুষ প্রদান ঘটনার বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কার্যক্রমও চালু হয়েছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে এই তদন্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজারেরও বেশি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। আর এসব ঘাঁটির বেশিরভাগই অবস্থিত সংঘাতময় পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে। লিবিয়ার সম্রাট রাজা ইদ্রিসকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ১৯৮৮ সালে গাদ্দাফি লিবিয়ায় অবস্থিত সব মার্কিন ঘাঁটি ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দেন। তবে পেন্টাগন উত্তর আফ্রিকায় তার যে সামরিক অবস্থান হারিয়েছে তারচেয়ে বেশি সে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। সৌদি আরব, ইরাক এবং আরো বেশ কিছু উপসাগরীয় দেশে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘটিত দু’দুটি যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলে বেশ বড় আকারের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে।
গত শতকের নববইয়ের দশকে সৌদি আরবে মুলমানদের পবিত্রতম ভূমির কাছাকাছি মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরব বিশ্বের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই ছিল সৌদি নাগরিক। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আরো একজন সৌদি নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই সৌদি আরব থেকে তার সৈন্যদের বড় একটি অংশ ফিরিয়ে আনলেও এখনো পর্যন্ত রাজধানী রিয়াদের কাছাকাছি গোপনে বেশ কিছু মার্কিন সৈন্যের ছোট ছোট ঘাঁটি রয়ে গেছে। ওই অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ওমানের মাসিরা দ্বীপে এখনো তার একটি সামরিক ঘাঁটি রেখে দিয়েছে। প্রতিবেশী কুয়েতের ঘাঁটিতে মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা পনের হাজার। অধিকৃত ইরাকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সংখ্যা কত তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। ওয়াশিংটন শুধু ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশটি থেকে পরিকল্পনামাফিক ব্যাপকসংখ্যক মার্কিন সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার পরও সেখানে বৃহদাকারের পাঁচটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে যাবে। বাহরাইনে অবস্থিত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ একটি নৌ ঘাঁটি। এটির অবস্থান হরমুজ প্রণালীর এমন এক স্থানে যেখান থেকে প্রতিবেশী ইরানকে নিয়ন্ত্রণ ও পুরো অঞ্চলের ওপর মার্কিন সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপন সহজ হয়।
ওবামা প্রশাসন যেখানে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত সেখানে খিলাফত শাসনকে কেন প্রশ্রয় দেয় সেটিও মার্কিন এই কৌশল থেকে বোঝা যায়। প্রেসিডেন্ট ওবামা ওই অঞ্চলে কার্যত তার পূর্বসূরি জর্জ ডব্লিউ বুশের নীতিই অনুসরণ করে চলেছেন। বুশ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর শাসক গোষ্ঠীর অপকর্মকে ওই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অপছন্দের দেশ ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য অস্ত্র হিসেবেই বিবেচনা করতেন। ওই অঞ্চলের আরব-ইসরাইল বিরোধকে ওয়াশিংটন সব সময়ই আরব-ইরান বিরোধে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করে এসেছে। তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে দানবীয় কর্মকান্ড হিসেবে প্রচার চালিয়ে পশ্চিমারা ইরান ও তার প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি বিরোধের সূত্রপাত ঘটাতে চেয়েছিল। তবে আরব বিশ্বে বর্তমানে বিপ্লবী পরিবর্তনের এক হাওয়া বইছে। এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে দেশগুলোতে সম্ভাব্য যেসব সরকার ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তারা ইরানকে হয়তো নিজেদের জন্য তেমন একটি হুমকি মনে করবে না।
কাতারে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটি আল উদেইড আফগান ও ইরাক যুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কয়েক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ৮০টি অত্যাধুনিক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিক্রি করতে রাজি হয় যার মূল্য ছিল প্রায় ১৫০০ কোটি ডলার। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সে দেশে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একমাত্র গভীর সমুদ্রবন্দরটিও সে ব্যবহার করার অনুমতি লাভ করে। সেই বন্দরে জঙ্গি বিমান বহনকারী যুদ্ধজাহাজ নোঙর করার ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১০ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের কার্ডিনিয়াল ডিফেন্স রিভিউতে (কিউডিআর) মন্তব্য করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বৈশ্বিক দায়দায়িত্ব পালনকারী এক বিশ্বশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে তার মোট ৪ লাখ সৈন্য মোতায়েন করে রেখেছে। সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটিকে বলেন, আরব উপদ্বীপের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণ মার্কিন মনোযোগ ও গুরুত্ব প্রদানের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ওই অঞ্চলটির সঙ্গে আমাদের স্বার্থ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। তিনি ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করে জানান, ওবামা প্রশাসন উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিক একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যুহ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। নভেম্বরে ওবামা প্রশাসন ঘোষণা দেয়, তারা কুয়েতের কাছে ৯০ কোটি ডলার মূল্যের পেট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করবে।
পেট্রাউস জানান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সেই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছ থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ও বন্দরসমূহ ব্যবহারের সুযোগকে কাজে লাগিয়েই যুক্তরাষ্ট্র এ জাতীয় যৌথ কর্মসূচির বাস্তবায়ন করতে পারছে। জর্ডানের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ় নিরাপত্তা বন্ধন রয়েছে। তবে এ দেশটিতেও এখন বিদ্রোহ বিক্ষোভ চলছে। মার্কিন আর্থিক সহায়তায় নির্মিত বাদশাহ আবদুল্লাহ ১১ স্পেশাল অপারেশনস ট্রেইনিং সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে জেনারেল পেট্রাউস জর্ডানকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য পুলিশ ও সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদানের ক্ষেত্রে দেশটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। আরব বিশ্বে বিশেষত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান চলতে থাকা গণবিক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের শিরঃপীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেবল নিজের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়- ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে অত্যাধুনিক যেসব সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র সেগুলো নিয়েও এখন তার চিন্তার অন্ত নেই। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগ পর্যন্ত শাহ শাসিত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে আঞ্চলিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করত। যুক্তরাষ্ট্র সে সময় শাহকে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেইসব সমরাস্ত্রের ওপর ইসলামিক রিপাবলিকান অব ইরানের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতিদ্রুতই এসব অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে, সে সময়কার এফ-১৪ জঙ্গি বিমানসহ যুক্তরাষ্ট্র নির্মিত অন্যান্য সমরাস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ খুঁজে পাওয়া ইরানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
হুসনি মোবারকের মিসরও ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক আঞ্চলিক প্রহরী। দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সামরিক উপঢৌকনও পেয়েছে। মোবারকের ক্ষমতাচ্যুতির পর যেসব সামরিক নেতৃত্ব এখন দেশ চালাচ্ছেন তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবেই সম্পর্কিত। তবে ওবামা প্রশাসন সেখানকার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিতই আছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক বশংবদ সেজে কাজ করতে পারবে না। এমনকি ইসরাইলের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান রক্ষা করে চলাও তার পক্ষে কঠিন হবে। কারণ ইসরাইল এখনো ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে পদদলিত করে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা তাই এখনো ওবামা প্রশাসনকে মিসরের সঙ্গে অনৈতিক সামরিক সহযোগিতামূলক লেনদেন রক্ষা করে চলারই পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে এর ফলে মিসরে মোবারক উত্তর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থাটির উত্থান ঘটবে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ব্যাপারে মনোযোগীই হবে।
তবে আরব বিশ্বের মানুষ ব্যাপারটিকে ভিন্নভাবেই দেখবে। যুক্তরাষ্ট্র যে সেখানকার কর্তৃত্ববাদী স্বৈরশাসকগোষ্ঠীকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করতে এবং খোদ আরব ভূমিতেই নিজস্ব সামরিক ঘাঁটি গড়ে তুলছে তা আরব জনগণের মর্যাদা এবং জাতীয়তাবোধকে ভয়ানকভাবে আহত করছে। তিউনিসিয়া এবং মিসরে যে গণআন্দোলন জন্ম নিয়েছে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরব বিশ্বের প্রত্যাঘাতের শুরুর পর্ব হিসেবেই আখ্যায়িত করা যায়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত এখন বধ্যভূমি / জ্যাসন মিকলেইন ও ক্রিসটেইন হোলসার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফরেন পলিসি ২০১১-এর জুলাই-আগস্ট সংখ্যায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের উপরে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। স্কট কার্নি, জ্যাসন মিকলেইন ও ক্রিসটেইন হোলসারের সেই প্রতিবেদনটির বাংলা ভাষান্তর করেছেন অরণ্য রাওল


গুটিশুটি হয়ে পোড়ো একটি দালানের ভেতর ঢুকে পড়েই ফেলানি তার সোনার তৈরি বিয়ের গয়নাগুলো পরে নিল। পঞ্চদশী ফেলানির বাবা নুরুল ইসলাম জানালা দিয়ে উঁকি মেরে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করলেন কাঁটাতারের বেড়াটা কত দূরে এবং এর অবস্থাটা কেমন। এই বেড়াটিই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা চিহ্নিত করে রেখেছে। আর এটিই ফেলানির বউ সাজার পথে সর্বশেষ বাধা।
এক সপ্তাহ পরই সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশ ভূখন্ডে অবস্থিত নিজের পৈতৃক গ্রামটিতে ফেলানির বিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢোকার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি। কারণ দিল্লি থেকে ভিসা ও পাসপোর্ট সংগ্রহ করতেই কয়েক বছর লেগে যাওয়ার কথা। তাছাড়া বাংলাদেশের যে গ্রামটিতে নুরুল ইসলাম বড় হয়েছেন সীমান্তবর্তী ভারতীয় বাসস্ট্যান্ড থেকে সেটির দূরত্ব মাইলখানেকেরও কম। তথাপি তারা জানত, কাজটি খুবই বিপজ্জনক। এটি সর্বজনবিদিত যে, সীমান্তে প্রহরারত ভারতীয় রক্ষীরা কাউকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেখলে গুলিটি আগে চালায় এবং প্রশ্নটি পরে করে। ইসলাম একজন দালালের মাধ্যমে সীমান্তরক্ষীকে ৬৫ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ টাকা ঘুষ পাঠিয়েছেন। তবে তার জানার কোনো সুযোগই ছিল না টাকাটা ঠিক হাতেই পড়েছে কিনা। বাবা আর মেয়ে প্রহরীদের পেছন ফেরার অপেক্ষায় রইল। তারা পেছন ফিরলেই একটি মই বেয়ে উঠে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে ওপারে পৌঁছে যাবে। দালালটি তাদের কয়েক ঘণ্টা বসিয়ে রাখল নিরাপদ সুযোগের অপেক্ষায়। কিন্তু ততক্ষণে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে সকালের ঘন কুয়াশা ভেদ করে। সুতরাং পার হওয়ার চেষ্টা করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাধা সরিয়ে নুরুল ইসলামই প্রথম সীমান্ত পার হয়ে গেলেন। কিন্তু ফেলানি যে দুর্ভাগা। তার সালোয়ার কামিজের পাড় কাঁটাতারে আটকে গেল। সে ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে এক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী দৌড়ে এসে খুব কাছ থেকে একটিমাত্র গুলি ছুড়ল ফেলানিকে লক্ষ্য করে। ঘটনাস্থলেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল ফেলানি। মেয়ের মৃতদেহটি কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেই বাবা পালিয়ে গেলেন। সীমান্তরক্ষীরা নামিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত মৃতদেহটি আরো অন্তত ঘণ্টা পাঁচেক সময় ওই একইভাবে কাঁটাতারের মধ্যেই ঝুলে ছিল। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা মৃতদেহটি পরের দিন সীমান্তের অপর পাড়ে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। জানুয়ারিতে ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর নুরুল ইসলাম বাকরুদ্ধ স্বরে আমাদের জানান, মৃতদেহটি তাদের কাছে ফেরত দেওয়ার আগে সৈন্যরা তার শরীর থেকে সোনার গয়নাগুলোও চুরি করে নিয়েছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের সীমান্ত বিষয়ক জটিলতা সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকে। অথচ এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার এক হাজার ৭৯০ মাইল দীর্ঘ সীমান্তটির বেশিরভাগ অংশেই বেড়া নির্মাণ করা হয়ে গেছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম রক্তঝরা সীমান্তঞ্চলে পরিণত হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা ফেলানির মতোই প্রায় এক হাজার মানুষকে এখানে গুলি করে হত্যা করেছে। ভারত তার ২৫ বছর মেয়াদি সীমান্তবেড়া নির্মাণের কাজটি আগামী বছরের মধ্যেই শেষ করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে খরচ পড়বে ১২০ কোটি মার্কিন ডলার। এই বেড়া নির্মাণকে ভারতীয়রা নিজেদের জন্য একটি সর্বরোগ হরণকারী প্রতিষেধক হিসেবে বিবেচনা করছে। তারা মনে করছে, এই বেড়া নির্মাণের ফলে মুসলিম জঙ্গিবাদ ও কাজের সন্ধানে বেআইনিভাবে ভারতে প্রবেশকারী বিদেশীদের আটকানো সহজ হবে। তাছাড়া দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে যে শরণার্থী সংকট বিরাজমান তার হাত থেকেও ভারত রেহাই পেয়ে যাবে এই সীমান্তবেড়ার কল্যাণে। কিন্তু বাংলাদেশীদের কাছে এই সীমান্তবেড়াটি তাদের এক নিকট প্রতিবেশীর অযৌক্তিক ভীতির চিহ্ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাদের কাছে মনে হচ্ছে, তাদের প্রতিবেশীটি তার নবআবিষ্কৃত সম্পদরাজির নিরাপত্তা বিধানে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যদিও দেশটির বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো চরম দারিদ্রে্যর মধ্যেই বসবাস করছে।এই সীমান্তবেড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির ধারক একদা বন্ধুপ্রতীম দেশ দুটির সম্পর্ক আজ কোন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। বুঝিয়ে দিচ্ছে একটি প্রতিবেশীকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য অন্য প্রতিবেশীটি কী পরিমাণ রক্ত ঝরাতে বদ্ধপরিকর।
ভারত তার এই পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীটির প্রতি যে সবসময়ই এতটা বিরূপ ছিল তা কিন্তু নয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ ১৯৭১ সালে রক্তাক্ত যে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল সেই যুদ্ধে তারা কিন্তু ভারতীয় অস্ত্রশস্ত্রই ব্যবহার করেছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধ বাংলাদেশের দুর্বল অবকাঠামোকে ধ্বংসই করে দিয়েছিল এবং দশ লাখেরও বেশি মানুষ সে সময় নিহত হয়। ফলে দেশটিকে অনিবার্য এক দুর্ভাগ্যই বরণ করে নিতে হয়েছিল। বাংলাদেশ এখন ১৬ কোটি মানুষের একটি দেশ- যা আয়তনে আইওয়ার চেয়েও ছোট। জনসংখ্যার অর্ধেকেরই দৈনিক মাথা পিছু আয়ের পরিমাণ ১.২৫ মার্কিন ডলারেরও কম। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যসূচকের বিবেচনায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারেই নিচের দিকে।
দুর্যোগ দুর্বিপাক দেশটির নিত্যদিনের সঙ্গী। একটি বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত দেশটির ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ৫৪টি নদী। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সব ধরনের নেতিবাচক প্রভাবেরই শিকার সে। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে যে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে তাতে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে ধীরে ধীরে সমুদ্রের লোনাজল প্রবেশ করছে। উজানে ভারত বাঁধ নির্মাণ করছে। আর হিমালয় থেকে নেমে আসছে গলিত হিমবাহ। সবকিছু মিলে ইতোমধ্যেই দেশটির অধিকাংশ উর্বর কৃষি জমিকে লবণাক্ত মরুভূমিতে পরিণত করেছে। ফলে এর সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ আরো অন্তত ডজনখানেক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, হ্যারিকেন ক্যাটরিনার মতো ঝড় যদি বাংলাদেশে আঘাত হানে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যার আশঙ্কা দিন দিন বেড়েই চলেছে, তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। এতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের হুমকি রয়েছে। আর অস্থিতিশীলতার এই ঢেউ বৈশ্বিকভাবেই অন্যত্র গিয়ে আঘাত হানবে। দেশটিতে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নতুন জাল বিস্তৃত হবে। খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সংঘর্ষ দেখা দেবে এবং অবশ্যই লাখ লাখ শরণার্থীর সৃষ্টি হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, তেমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে বাস্ত্তচ্যুত এই মানুষ প্রথমেই কোথায় যেতে চাইবে। বাংলাদেশের সঙ্গে মাত্র দুটি দেশের সীমান্ত রয়েছে। এর একটি হচ্ছে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত এবং অন্যটি সামরিক একনায়কত্বের শাসনাধীন বার্মা। আপনিই বলুন, কোন দেশটি আপনি বেছে নেবেন?
শরণার্থী গ্রহণ করার একটি ইতিহাস ভারতের আছে। সে তিববতের প্রবাসী সরকার থেকে শুরু করে শ্রীলংকার গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী পর্যন্ত সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে। পূর্ব দিক থেকে গণহারে অভিবাসীর আগমন আশঙ্কা করে নয়াদিল্লি তাই একটি বালির বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যয়বহুল এবং স্থায়ী একটি পুনর্বাসন অঞ্চল নির্মাণ না করে সে বরং সশস্ত্র রক্ষী সম্বলিত একটি সীমান্তবেড়া নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। এটি শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার এই কর্মসূচিকে আরো বেশি বেগবান করে। উদ্দেশ্য, দলীয় কর্মীদের মধ্যকার মুসলিম বিদ্বেষ প্রশমিত করা। বেড়ার দৈর্ঘ্য বাড়তে থাকল এবং সেই সঙ্গে বেড়ে চলল হত্যাকান্ডের  ঘটনাও। বাংলাদেশের রাজনীতিকরা বছরের পর বছর ধরে এই হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন। অবশেষে ভারতীয় পক্ষও দফায় দফায় ওয়াদা করে, সীমান্তরক্ষীরা অবৈধ পারাপারকারীদের ওপর জীবনহানিকর মারাত্মক কোনো অস্ত্র ব্যবহার করবে না। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ তারা রাখেনি। আগামী বছরের মধ্যেই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সব সীমান্তপথ বেড়া দিয়ে আটকে দেওয়া হবে। তবে একথাও ঠিক, নিরাপত্তার কড়াকড়ি দিয়ে সীমান্ত অঞ্চলকে বিপদসংকুল করে তোলা গেলেও তাকে কিন্তু প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করা যাবে না। একশ’রও বেশি সীমান্তবর্তী গ্রাম অবৈধ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর মধ্য দিয়ে দৈনিক কয়েক হাজার অবৈধ অভিবাসী আসা-যাওয়া করছে। এসব গ্রামের প্রতিটির রয়েছে একজন করে লাইনম্যান। উত্তর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে সক্রিয় কয়কোয়েট বা ক্ষুদ্র কুকুরদের সঙ্গে এদের কর্মকান্ডের মিল রয়েছে। এরা চোরাচালানির সঙ্গে জড়িত থাকে। সীমান্তরক্ষীদের ঘুষ দিয়ে অন্যমনস্ক করানোর ছলে অবৈধ অভিবাসীদের পারাপারে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরিটি রায় বলেন, সঠিক জায়গায় ঘুষ দিতে পারলে পুরো গ্রামটিই এপার থেকে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব। সংগঠনটি বাংলাদেশের ‘অধিকার’ ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে যৌথভাবে গত ডিসেম্বরে সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। রায় বলেন, সাধারণত লাইনম্যানের সঙ্গে একটি বোঝাপড়া না করে কেউই সীমান্ত পার হওয়ার ঝুঁকি নেয় না। কেউ যদি লাইনম্যানদের ফাঁকি দিয়ে নিজে নিজেই সীমান্ত পার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তবে লাইনম্যানরা সেটি সীমান্তরক্ষীদের নজরে নিয়ে আসে এবং গুলি চালাতে বলে। অদক্ষ একটি ঘুষ প্রদান পদ্ধতি চালু থাকার কারণে এক দশকে প্রায় এক হাজার নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে কিরিটি রায় মন্তব্য করেন।
সীমান্তবেড়ার পশ্চিম পাড়ে অভিবাসনকে কেন্দ্র করে একটি কুৎসিত রাজনীতি চালু রয়েছে। সেখানকার জনমত বাংলাদেশ সীমান্ত দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষে। ফলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। নয়াদিল্লিভিত্তিক ইন্সটিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড এনালাইসিসের হিসাব মতে, ভারতে বর্তমানে এক থেকে দুই কোটি অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী অবস্থান করছে (যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ মেক্সিকান অভিবাসীর সংখ্যা ১ কোটি ১২ লাখ)। মুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এমনিতেই খুব একটা ভালো নেই। উপরন্তু সাম্প্রতিক সময়গুলোতে বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র ইসলামী মৌলবাদের যেভাবে উত্থান ঘটছে তাতে সেই সম্পর্কে আরো ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। ভারতের রাজনীতিকরা এই অবস্থাটির সুযোগ নেওয়ার জন্য বসে আছেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ২০০৯ সালে বলেছিলেন, বাংলাদেশীদের ভারতে আসার কোনো দরকার নেই। বিজেপি’রও মনে করে, বাংলাদেশের সাদর আমন্ত্রণ জানানোর কোনো কারণ নেই। বিজেপি’র বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের নেতা তথাগত রায় তো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে জনবিধ্বংসী মাইন পুঁতে রাখারই আহবান জানিয়েছেন। বাংলাদেশী অভিবাসীদের ভারতে প্রবেশের আশঙ্কা যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবেই রূপ নেয় তবে ভারতের ৯০ কোটি হিন্দুর ধর্মান্তরিত হয়ে যাওয়া কিংবা সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া ছাড়া কোনো গত্যন্তরই থাকবে না বলে রায় মনে করেন।
সীমান্ত অঞ্চল ক্রমেই একটি বধ্যভূমিতে পরিণত হচ্ছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা বরাবরই দাবি করে আসছেন, সীমান্তরক্ষীরা নেহাৎই আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি করে থাকে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’ এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের এক প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, নিহতদের মধ্যে এমন একজনেরও পরিচয় পাওয়া যায়নি যার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল। কারো হাতে বড় জোর একটি লাঠি কিংবা কাস্তে ছিল। মানবাধিকার সংগঠন দুটি বিএসএফের বিরুদ্ধে নির্বিচারে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগ এনেছে। নিহতদের অধিকাংশই ছিল কৃষক। এরা বেঠিক সময়ে বেঠিক স্থানে পড়ে ঘটনার শিকার হয়েছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশী সৈন্যরা আমাদের জানায়, ছয়জন ভারতীয় সীমান্তরক্ষীকে তারা শাহজান আলী নামের এক বাংলাদেশীকে সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ড এলাকায় প্রলুব্ধ করার ভঙ্গিতে ডেকে নিয়ে যেতে  দেখেন। এরপর তারা লোকটিকে উলঙ্গ করে প্রহার করতে থাকে। তারা তার পা দুটি ভেঙে ফেলে। আর আহত অবস্থায় বাংলাদেশ সীমান্তে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার আগে তারা তার পুরুষাঙ্গটি ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। লোকটি পরে রক্তক্ষরণের ফলে মারা যায়। শাহজাহান আলির ঘটনা প্রত্যক্ষকারী বাংলাদেশী একজন সৈনিক বলেন, ভারতীয় রক্ষীদের উন্মত্ততা দেখে মনে হয়েছে তারা মাতাল অবস্থায় ছিল। মনে হয়েছে তারা যেন নেশাগ্রস্ত ছিল। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কোনো ইস্যুতে পরিণত না হওয়ায় বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা এসব ঘটনায় তাদের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের রক্ষীদের বিরুদ্ধে বন্দুক চালাতে পারে না। তারা কেবল নীরবে স্বদেশীদের মৃতদেহগুলো তুলে নিয়ে আসে।
তবে ফেলানির মৃত্যু বাংলাদেশে উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা তার মৃতদেহের ছবি দেশের সব সংবাদপত্রই প্রথম পৃষ্ঠায় ছেপেছে। রাজধানী ঢাকার বহু দেয়ালেই রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ফেলানির ছবিসমেত ‘সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা হোক’ লেখা পোস্টার সেঁটে রাখতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং বর্তমানে বিরোধী দল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, সীমান্তের বেড়াটি হচ্ছে আমাদের বার্লিন দেয়াল। এই হত্যাকান্ডটি ভারতকেও কিছুটা সচেতন করে তুলেছে বলে মনে হয়েছে। মার্চে নয়াদিল্লি আবারো ঘোষণা দেয়, সীমান্তরক্ষীরা মানুষ হত্যাকারী অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকবে এবং এই ঘোষণা একবারের জন্য হলেও কার্যকর হয়েছিল। এক দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনো একটি মাস অতিক্রান্ত হলো যে সময়ের মধ্যে ভারতীয় সৈন্যরা সীমান্তে কোনো হত্যাকান্ড ঘটায়নি।
কিন্তু এপ্রিলে এসেই আবার ভারতীয় সৈন্যরা তাদের অস্ত্র তাক করল এবং একজন গরু ব্যবসায়ীকে হত্যা করল। এছাড়া অন্য তিনটি ঘটনায় আরো তিনজনকে তারা হত্যা করেছে। মনে রাখা দরকার, তারের বেড়ার কার্যকারিতা যখন দুর্বল হতে থাকবে সীমান্ত অঞ্চলকে বধ্যভূমিতে পরিণত করার উত্তেজনাও তখন বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে।